হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াতে সাত দেশের সাহায্য চাইলেন ট্রাম্প
হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাতটি দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে মার্কিন প্রশাসন। রোববার (১৫ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য জানিয়েছেন। তেহরান বর্তমানে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের জন্য কার্যত বন্ধ করে রাখায়, জাহাজগুলোর সুরক্ষায় ওই দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যেই তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এমন অবস্থায় ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, যেসব দেশ উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, হরমুজ প্রণালী রক্ষার দায়িত্ব মূলত তাদেরই।
ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটন ফেরার পথে প্রেসিডেন্টদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বিমান 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'-এ সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'আমি দাবি করছি যে এই দেশগুলো এগিয়ে আসুক এবং তাদের নিজেদের এলাকা রক্ষা করুক, কারণ এটি তাদেরই এলাকা। এটি এমন একটি জায়গা যেখান থেকে তারা তাদের জ্বালানি পায়।'
ট্রাম্প ওই সাতটি দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও সপ্তাহের শেষে তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি আশা করছেন যে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের পথ এই হরমুজ প্রণালী সচল রাখতে অনেক দেশই তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন ও অন্য দেশগুলো এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
রোববার ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর হরমুজ প্রণালী রক্ষার বিষয়ে চাপ বাড়িয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ন্যাটো সদস্যরা যদি ওয়াশিংটনকে সহায়তা করতে এগিয়ে না আসে তবে এই জোটের ভবিষ্যৎ 'খুবই খারাপ' হতে পারে।
ট্রাম্প আরও জানান, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তবে এই সংঘাত নিরসনে তেহরান গুরুত্বের সাথে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
তেলের উচ্চমূল্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে মার্কিন কর্মকর্তারা রোববার ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে এবং এরপরই জ্বালানির দাম কমতে শুরু করবে। যদিও ইরান দাবি করেছে, তারা এখনও 'স্থিতিশীল ও শক্তিশালী' এবং নিজেদের রক্ষায় তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।
সপ্তাহের শেষে ট্রাম্প ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপে আরও বড় হামলার হুমকি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধের ইতি টানতে তিনি এখনই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে রাজি নন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বেনামী মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসন সংকীর্ণ এই জলপথে জাহাজগুলোকে পাহারা বা 'এসকর্ট' দেওয়ার জন্য একটি বহুজাতিক জোট গঠনের ঘোষণা দিতে পারে। তবে এই অভিযান যুদ্ধ চলাকালীন নাকি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শুরু হবে, তা নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে।
প্রণালীটি উন্মুক্ত করতে অন্যান্য দেশের কাছ থেকে ঠিক কী ধরণের সাহায্য চান, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, কিছু দেশের কাছে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজ (মাইনসুইপার) এবং 'বিশেষ ধরণের বোট (নৌকা) রয়েছে যা আমাদের সাহায্য করতে পারে'।
উপসাগরীয় অঞ্চলের উত্তেজনার কারণে সোমবার এশিয়ার বাজারেও তেলের দাম চড়া ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম ব্যারেল প্রতি ১০৩ দশমিক ২৭ ডলার এবং মার্কিন বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯৭ দশমিক ৯৯ ডলারে কেনাবেচা হয়েছে।
আলোচনার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি নাকচ করল ইরান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন ইরান আলোচনার জন্য তৈরি, কিন্তু ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সেই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। রোববার তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান কখনো কোনো যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার জন্য আবেদন জানায়নি।
সিবিএস নিউজের 'ফেস দ্য নেশন' অনুষ্ঠানে আরাগচি বলেন, 'আমরা কখনোই কোনো যুদ্ধবিরতি চাইনি, এমনকি আলোচনার কোনো প্রস্তাবও দিইনি। যতদিন প্রয়োজন হবে, আমরা নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুত আছি।'
বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই সংঘাত খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, এমনকি তার আগেও এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রোববার বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করবে এবং খুব শিগগিরই এই সংঘাতের অবসান হবে। তবে তিনি এখনই 'বিজয়' ঘোষণা করার কোনো কারণ দেখছেন না। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি শুধু বলতে পারি তারা (ইরান) এখন বিধ্বস্ত। আমরা যদি এই মুহূর্তে চলেও যাই, তবে তাদের আবারও আগের অবস্থায় ফিরতে ১০ বছর বা তার বেশি সময় লাগবে। তবে আমি এখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি না।'
এদিকে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়া এবং দেশটির নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আরাগচি ইরানের দৃঢ়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'এটি আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কোনো যুদ্ধ নয়। আমরা যথেষ্ট স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী আছি। আমেরিকানদের সাথে কথা বলার কোনো কারণ আমরা দেখছি না; কারণ যখন আমরা তাদের সাথে কথা বলছিলাম, তখনই তারা দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।'
