হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় ‘সব ধরনের বিকল্প’ নিয়ে ভাবছে যুক্তরাজ্য: এড মিলিব্যান্ড
হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন রুট সুরক্ষিত করতে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে কাজ করাসহ 'সব ধরনের বিকল্প' নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড।
গত শনিবার (১৪ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘোষণায় এই পানিপথটি 'যেভাবেই হোক' খুলে দেওয়ার হুমকি দেন। এ কাজের জন্য তিনি যুক্তরাজ্য, চীন ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশকে তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানান। এরপরই মিলিব্যান্ড এই মন্তব্য করলেন।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, জাহাজ চলাচলের জন্য এই প্রণালিটি নিরাপদ করা 'অত্যন্ত জরুরি'। তবে সরকার ঠিক কী কী বিকল্প নিয়ে ভাবছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পানিপথটি ইরান কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানির দামে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলতে ইরান এই প্রণালি বন্ধ রাখা অব্যাহত রাখবে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এর মধ্যে এই সরু প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার সময় বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়।
জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে ইরান এই পানিপথে মাইন পেতে রেখেছে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবিসি ওয়ান-এর 'সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ' অনুষ্ঠানে মিলিব্যান্ড বলেন, প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া বিশ্বের জন্য একটি 'অগ্রাধিকার'। তিনি আরও বলেন, 'মাইন খোঁজার ড্রোন দেওয়াসহ নানাভাবে আমরা এখানে অবদান রাখতে পারি।'
যুক্তরাজ্য ওই অঞ্চলে ড্রোন বা জাহাজ পাঠানোর কথা ভাবছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মিলিব্যান্ড বলেন, 'আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন যে প্রণালিটি খুলে দিতে সাহায্য করতে পারে এমন সব বিকল্প নিয়েই আমরা মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছি।'
কোনো সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মিলিব্যান্ড পুনর্ব্যক্ত করেন যে, 'প্রণালিটি পুনরায় চালুর সবচেয়ে ভালো ও নিশ্চিত উপায় হলো এই সংঘাতের অবসান ঘটানো।'
একই অনুষ্ঠানে পরে কথা বলতে গিয়ে ছায়া জ্বালানি মন্ত্রী ক্লেয়ার কৌতিনহো বলেন, জাতীয় স্বার্থে যুক্তরাজ্যের উচিত মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ বা ড্রোন পাঠানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় খুলে দেওয়া এবং বিদেশে সামরিক সম্পদ রক্ষা করা যুক্তরাজ্যের স্বার্থের অনুকূলে। তিনি আরও যোগ করেন, লেবার পার্টির চেয়ে কনজারভেটিভ পার্টি ক্ষমতায় থাকলে মার্কিন মিত্রদের অনেক আগেই যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিত।
এদিকে, লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি মনে করেন, প্রণালিটি সুরক্ষিত করতে যুক্তরাজ্যের কোনো জাহাজ পাঠানো উচিত নয়। বরং তাদের উচিত যুদ্ধ 'কমানোর' বা ডি-এস্কেলেট করার দিকে মনোযোগ দেওয়া।
এই 'অবৈধ ও ক্ষতিকর যুদ্ধে' ট্রাম্পকে 'খুবই বেপরোয়া' আখ্যা দিয়ে স্যার এড বলেন, 'যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই জানেন না তিনি কী করছেন, তার কথায় যুক্তরাজ্যের ওঠা-বসা করা উচিত নয়।'
ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছিল। এর অর্থমূল্য বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার (৪৪,৭০০ কোটি পাউন্ড)।
এছাড়া এটি হিলিয়াম, রাসায়নিক সালফেট এবং সার তৈরিতে ব্যবহৃত ইউরিয়ার মতো অন্যান্য পণ্যের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, যারা দেশের 'শত্রু' নয়, তাদের জাহাজের জন্য প্রণালিটি খোলা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, 'যেসব দেশ এই পথ দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে কথা বলতে চায়, তাদের জন্য ইরানের দরজা খোলা।'
রবিবার তিনি দাবি করেছেন, বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তবে তিনি তাদের নাম প্রকাশ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে তেহরান জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে মূল লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে যে, ওই দুই দেশ বা তাদের অংশীদারদের দিকে যাওয়া যেকোনো ট্যাঙ্কারই তাদের 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু'।
ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স-এর সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, এই সংঘাতের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শিপিং লেনের কাছে অন্তত ১৬টি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি তেলের ট্যাঙ্কারও রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সংঘাতের আগে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল ৭১ ডলার। সোমবার তা প্রায় ১২০ ডলারে উঠে যায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো বেশ চড়া।
ইরানের ওপর হামলার জন্য শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। তবে পরে তিনি গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র সাইটগুলোর ওপর 'প্রতিরক্ষামূলক' মার্কিন পদক্ষেপে সম্মতি দেন। তবে তিনি তখনও বলেছিলেন যে যুক্তরাজ্য 'আকাশ থেকে সরকার পরিবর্তন'-এ বিশ্বাস করে না।
যুদ্ধের বিষয়ে স্টারমারের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ট্রাম্প তাকে 'উইনস্টন চার্চিল নন' বলে কটাক্ষ করেছিলেন। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, ওই অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর কোনো প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, 'আমরা যুদ্ধ জেতার পর তিনি তাতে যোগ দিতে চাইছেন।'
রবিবার আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে দুটি মার্কিন বি-১ ল্যান্সার বোমারু বিমান উড্ডয়ন করে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো শক্তিশালী 'বাঙ্কার বাস্টার' বোমা এবং ক্রুজ মিসাইল বহন করছিল।
এই যুদ্ধে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর তিনটি বড় বোমারু বিমানের মধ্যে (বাকি দুটি হলো বি-৫২ এবং বি-২ স্টেলথ) ল্যান্সার সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বহন করতে পারে। বোয়িংয়ের মতে, এগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর দ্রুততম বোমারু বিমান।
ধারণা করা হচ্ছে, বোমারু বিমানগুলোর ইরানে পৌঁছাতে প্রায় সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগবে এবং পুরো মিশনটি শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ১৫ ঘণ্টা।
