যেভাবে মুসলিমদের নিয়ে ভয় ও বিদ্বেষ উসকে দিচ্ছেন সদগুরু
২০১৮ সালের ঘটনা। অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাওয়াত সদগুরু জগগি বাসুদেবকে ভারতের রাজস্থানের সংগঠন করণী সেনার তাণ্ডব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। একটি সিনেমা নিষিদ্ধ করার দাবিতে সংগঠনটি তখন বাস পোড়ানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছিল। তখন বাসুদেব বলেছিলেন, সরকারি সম্পত্তি পোড়ানো নাকি রাগ প্রকাশের এক ভারতীয় কায়দা।
তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্র যে কয়েক দিনের জন্য এই ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেয়, তা এক 'অদ্ভুত প্রজ্ঞা, কিন্তু তা প্রজ্ঞাই'। তার কথাগুলো যেন ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর সুরেই বাজছিল। দীপেশ মনে করেন, এ ধরনের প্রতিবাদ একধরনের 'সামষ্টিক ক্ষোভ', যেখানে জনগণ নৈতিকভাবে নিজেদের সঠিক মনে করে রাষ্ট্রকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
কিন্তু ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই দেখা গেল উল্টো চিত্র।নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনকারীদের কড়া সমালোচনা করে তিনি টুইট করলেন। তিনি লিখলেন, 'ইস্যু যা-ই হোক, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।' তিনি আরও বলেন, 'যেসব বাস পোড়ানো হচ্ছে, তা সরকারের নয়; বরং আমাদের করের টাকায় কেনা জনগণের সম্পদ। যারা সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করছে, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে খরচ উসুল করতে হবে।'
এক ভিডিও বক্তৃতায় তিনি আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করেন এবং তাদের ওপর পুলিশি নির্যাতনকে যৌক্তিক বলে চালানোর চেষ্টা করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে যখন সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন, তখন এই বক্তব্য আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
এই আধ্যাত্মিক গুরুর রয়েছে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ইশা ফাউন্ডেশন। হাজার হাজার মানুষ তার শিক্ষা ও উপদেশ ভক্তিভরে শোনে। ২০১৮ সালে বাস পুড়িয়ে 'রাগ মেটানো'র অনুমতি দেওয়া, আর ২০১৯ সালের শেষে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি—জগগি বাসুদেব এত দ্রুত বদলালেন কেন?
রাজপুতদের প্রতিবাদের প্রতি কি তার বেশি সহানুভূতি ছিল? নাকি দেশজুড়ে সিএএ বিরোধী আন্দোলনে বিপুল সংখ্যক মুসলিম অংশ নিয়েছিল বলেই তার এই ভোলবদল?
'দেশবিরোধী' তকমা
ভারতের রাজনীতিতে মুসলিম পরিচয়টিই যেন ভীতির সঞ্চার করে। অনেকের সন্দেহ, তাদের মধ্যে দেশবিরোধী ও উদারতাবিরোধী মনোভাব লুকিয়ে আছে। রাজনীতিতে মুসলিমদের প্রকাশ্য উপস্থিতি দেখলেই তাকে রক্ষণশীল বা এমনকি 'জিহাদি' মানসিকতার বলে সন্দেহ করা হয়। মুসলিম, তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের প্রতি ভারতীয় পুলিশের এমন কুসংস্কার গবেষণায় উঠে এসেছে।
সদগুরু হয়তো এই মনোভাবকেই আরও উসকে দিচ্ছেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, গত বছর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের এক মুসলিম ছাত্রকে তিনি 'তালিবানি' বলে সম্বোধন করেছিলেন। বর্ণহিন্দুদের প্রতি বাসুদেবের সমর্থনের পাশাপাশি তফসিলি জাতির ওপর সহিংসতা নিয়ে তার নীরবতাও লক্ষণীয়।
গত মাসে উত্তর প্রদেশে প্রতিবাদী মুসলিমদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। সরকারি সম্পত্তির ক্ষতির জন্য তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এমনকি পুলিশের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সম্পত্তি ধ্বংস করার অভিযোগও উঠেছে। এই সময় জগগি বাসুদেব যেন রাষ্ট্রেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন। ২০১৮ সালের এপ্রিলেও দলিতদের বিরুদ্ধে একই রকম পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল।
এসসি-এসটি অ্যাক্ট লঘু করার প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে তারা রাস্তায় নেমেছিল। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে অন্তত নয়জন দলিত নিহত হন। সুপ্রিম কোর্ট শেষমেশ তাদের সেই (ভুল) রায় ফিরিয়ে নিলেও ততক্ষণে দলিত আন্দোলনকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন।
সীমাবদ্ধতা থাকলেও, সরকারি সম্পত্তির ওপর এই প্রতীকী সহিংসতা প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতিবাদের সবচেয়ে কার্যকর ভাষা। নকশাল বা অন্য চরমপন্থীদের মতো এরা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চায় না। বরং অদ্ভুত শোনালেও, এই সহিংসতা রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি তাদের আস্থারই প্রতিফলন। এটি আসলে বৈষম্যহীন ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য রাষ্ট্রের কাছে একধরনের আকুতি।
প্রতিবাদ, রাজনীতি ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলোতে বাসুদেবের মন্তব্য কি সত্যিই আমাদের বোঝাপড়া বাড়ায়? বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতা কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকা উচিত ছিল না? বাসুদেবের কাছে জাতপ্রথা, নিরামিষভোজী হওয়া, শবরীমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশ নিষেধ এবং গোরক্ষা—এ সবই এক মহান সভ্যতার লক্ষণ। অবশ্য এসব উপাদান মূলত সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের ওপর সুবিধাপ্রাপ্তদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই কাজ করে।
সদগুরু বাসুদেব সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতাকে যেভাবে দেখেন, তার শেকড় অভিজাত হিন্দু ঐতিহ্যের গভীরে। তিনি মুসলিমদের নতুন যুগের 'ম্লেচ্ছ' বা 'অস্পৃশ্য' হিসেবে দাঁড় করান। বর্তমানে মুসলিমদের এই প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে রাজনীতির মঞ্চে নিম্নবর্ণের উত্থানের এক সমান্তরাল মিল রয়েছে। বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতার 'বিশুদ্ধ' জগতে হিন্দু-অস্পৃশ্যদের কোনোমতে জায়গা দেওয়া হলেও, পশ্চিমারা এবং বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বকে 'অন্য' বা পর হিসেবে দেখানো হয়।
বি আর আম্বেদকর ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়কে একতরফাভাবে 'আক্রমণকারী' হিসেবে চিহ্নিত করার বিপদের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অভিজাত 'হিন্দু রাজ' বা হিন্দু রাষ্ট্রকেও হুমকি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন, 'যদি হিন্দু রাজ সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে নিঃসন্দেহে তা হবে এই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। হিন্দুরা যা-ই বলুক না কেন, হিন্দুধর্ম স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রীর জন্য এক বিপদ। সেই হিসেবে এটি গণতন্ত্রের সঙ্গে বেমানান। যেকোনো মূল্যে হিন্দু রাজ প্রতিরোধ করতে হবে।'
শ্রেণিবৈষম্য জোরদার করা
বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতা কেবল হিন্দু অভিজাতদের গর্বই বাড়ায় না, এটি শ্রেণিবৈষম্যের মতাদর্শও প্রচার করে। এটি তথাকথিত বিশুদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং অসভ্যতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। তার দর্শন কার্যত শ্রেণিবৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আহ্বান জানায়। বাসুদেবের বিশ্বদর্শন অনুযায়ী, ভারত এমন এক 'পবিত্র' জগত যা উদার গণতন্ত্রের শর্ত মেনে কেবল 'বিশুদ্ধ' হিন্দু নাগরিকদের জন্যই তৈরি।
সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে যেমন কোনো সৈয়দনা বা ইমামকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না, তেমনি রাজনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের বিষয়ে বাসুদেবের 'জ্ঞান'কেও সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। জগগি বাসুদেবের এই নব্য যুগের ইংরেজি-বলা আধ্যাত্মিকতা সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের ধারণাগুলোকেই আরও বিস্তৃত করছে।
একই সঙ্গে এটি মুসলিমদের একটি একরৈখিক ছবি তৈরি করছে: তারা 'অন্য', অতীতের আক্রমণকারী, বর্তমানের দেশবিরোধী, সহিংস ও বর্বর। এই সব তকমাই মূলত আধুনিক যুগের 'ম্লেচ্ছ' ধারণারই নামান্তর।
