২০২৫ সালে ভারতে ১,৩১৮টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ৯৮ শতাংশেরই লক্ষ্য ছিল মুসলিমরা: প্রতিবেদন
ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ৩১৮টি এ ধরনের ঘটনা ঘটে। গত বছর ভারতে প্রতিদিন গড়ে অন্তত চারটি করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
'ইন্ডিয়া হেট ল্যাব'-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৯৮ শতাংশ বা ১ হাজার ২৮৯টি ছিল মুসলিমবিদ্বেষী। খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে এমন ঘটনা ঘটেছে ১৬২টি, যা আগের বছরের চেয়ে ৪১ শতাংশ বেশি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মিউজিয়ামের এক গবেষণায় অভ্যন্তরীণ গণহত্যার ঝুঁকির তালিকায় ভারতকে ১৬৮টি দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে। এমনকি বড় ধরনের কোনো সহিংসতা বা যুদ্ধ নেই—এমন দেশগুলোর তালিকায় ভারত শীর্ষে।
বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সিংহভাগই ঘটছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে। 'ইন্ডিয়া হেট ল্যাব'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে হওয়া মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ৮৮ শতাংশই রেকর্ড করা হয়েছে বিজেপি বা তাদের জোট সরকার ক্ষমতায় থাকা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে।
তালিকায় ২৬৬টি ঘটনা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে উত্তর প্রদেশ। এরপরই রয়েছে মহারাষ্ট্র (১৯৩টি), মধ্যপ্রদেশ (১৭২টি) ও উত্তরাখণ্ড (১৫৫টি)। ২০২৪ সালের তুলনায় এসব রাজ্যে এমন ঘটনা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের জাতীয় রাজধানী অঞ্চল দিল্লিতে এমন ঘটনা ঘটেছে ৭৬টি।
ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৭১টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি। 'লাভ জিহাদ', 'ল্যান্ড জিহাদ' ও 'থুক (থুতু) জিহাদ'-এর মতো বিভিন্ন ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে এসেছেন তিনি। তার প্রশাসনের অধীনে উত্তরাখণ্ডে 'অবৈধ স্থাপনা' উচ্ছেদের নামে মুসলিমদের মালিকানাধীন ঘরবাড়ি ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং বৈষম্যমূলক শাসনব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
তালিকায় আরও আছেন আন্তর্জাতিক হিন্দু পরিষদের প্রধান প্রবীণ তোগাদিয়া (৪৬টি) ও বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় (৩৫টি)।সহিংসতার উসকানিদাতাদের তালিকায় প্রথম পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নীতেশ রাণে। একটি ঘটনায় তিনি নিজেকে হিন্দুদের 'গাব্বার' বলে দাবি করেন এবং মুসলিমদের প্রতি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেন। অন্য এক বক্তব্যে তিনি মুসলিমদের 'জিহাদি' ও 'সবুজ সাপ' হিসেবে অভিহিত করেন। তার দাবি, 'হিন্দু রাষ্ট্রে' সব ধর্ম সমান নয়, কারণ এখানে 'হিন্দুরাই সবার আগে'।
বিরোধী দল শাসিত রাজ্যগুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও তা আগের বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ কমেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে হাতিয়ার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গত বছরের মার্চে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করলে তিনি মুসলিম বিধায়কদের 'শারীরিকভাবে বিধানসভা থেকে বের করে দেবেন'।
২০২৫ সালে ভারতে হওয়া মোট বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় ৫০ শতাংশ বা ৬৫৬টি ক্ষেত্রে বিভিন্ন 'ষড়যন্ত্রতত্ত্ব' ব্যবহার করা হয়েছে। বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রায় অর্ধেকই ছিল বিভিন্ন কাল্পনিক 'জিহাদ' কেন্দ্রিক। এর মধ্যে রয়েছে লাভ জিহাদ, ল্যান্ড জিহাদ, জনসংখ্যা জিহাদ, থুক জিহাদ, শিক্ষা জিহাদ, ড্রাগ জিহাদ ও ভোট জিহাদ। আগের বছরের তুলনায় এ ধরনের ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ব্যবহার বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
১৯২টি বক্তব্যে বাঙালি মুসলিমদের 'বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী' ও মুসলিমদের উদ্দেশ্য করে 'উইপোকা', 'পরজীবী', 'পোকা-মাকড়', 'শূকর', 'পাগলা কুকুর' ও 'রক্তচোষা জম্বি'র মতো অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ৩০৮টি বক্তব্যে সরাসরি সহিংসতা এবং ১৩৬টিতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাম নবমীর মিছিল ও পাহলগাম হামলার পর এপ্রিল মাসে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা যায়।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে। ওই এক মাসেই ১৫৮টি ঘটনা ঘটে, যার বড় অংশই ছিল রাম নবমীর মিছিলকে কেন্দ্র করে। গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, রাম নবমীর মিছিলগুলো পরিকল্পিতভাবে মুসলিম প্রধান এলাকার মধ্য দিয়ে নেওয়া হয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে পাহলগাম সন্ত্রাসী হামলার পর দেশজুড়ে মুসলিমবিরোধী প্রচারণা তীব্রতর হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে—এই ১৬ দিনের ব্যবধানে অন্তত ৯৮টি ঘৃণা ছড়ানোর সমাবেশ হয়েছে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিদ্বেষ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের লক্ষ্য করে ৬৯টি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। দিল্লি, বিহার, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি আয়োজনে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং তাদের যুব শাখা বজরং দল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো গত বছরও তারা মূল ভূমিকা পালন করেছে। মোট ঘটনার ২২ শতাংশ কর্মসূচি তারা সরাসরি আয়োজন বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং বিজেপি ঐতিহাসিকভাবেই সংখ্যালঘু বিরোধী ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়াতে ভিএইচপি এবং বজরং দলের মতো সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে আসছে। এসব সংগঠন তাদের আদর্শিক এজেন্ডাকে সরাসরি রাজপথে বাস্তবায়নে কাজ করে।
২৭৬টি বক্তব্যে মসজিদ, মাজার ও গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয় সরিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করার উসকানি দেওয়া হয়েছে। উত্তর প্রদেশের জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মাহি ইদগাহ মসজিদ ছিল এই হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
বছর শেষে বড়দিনের সময় খ্রিষ্টানদের ওপর সহিংসতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন স্থানে খ্রিষ্টানদের হয়রানি এবং তাঁদের প্রার্থনা সভায় বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে ভয়ংকর বিদ্বেষী কাঠামো কাজ করছে, এখন খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ঘৃণা ও অপপ্রচার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ভারতে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিষয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে বরাবরের মতোই এক ধরনের এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
গত বছরের জুলাই মাসে লোকসভায় রাজনীতিবিদদের দেওয়া বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং এ সংক্রান্ত নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এর জবাবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি সুকৌশলে পুরো দায়ভার রাজ্য সরকারগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, 'জনশৃঙ্খলা' এবং 'পুলিশ' মূলত রাজ্যের বিষয়।
এদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট আগে এ বিষয়ে কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা দেখালেও ২০২৫ সালে তাদের অবস্থানে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। নভেম্বরে সর্বোচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ জানায়, সারা দেশে ঘটা প্রতিটি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ সংক্রান্ত প্রতিকারের জন্য আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট ও স্থানীয় পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন আদালত।
তবে দেশজুড়ে এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে কর্ণাটক সরকার। ভারতে প্রথম কোনো রাজ্য হিসেবে তারা 'কর্ণাটক হেট স্পিচ অ্যান্ড হেট ক্রাইম (প্রিভেনশন) বিল, ২০২৫' পাস করেছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রাজ্য পর্যায়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে সংজ্ঞায়িত করা এবং এর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলের ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে পাস হওয়া এই আইনে বিদ্বেষমূলক অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার রুপি জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। জনসমক্ষে মৌখিক বা লিখিত বক্তব্য অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো ঘৃণা—সবই এই আইনের আওতায় আসবে।
