১৮১৭ সালে অজ্ঞাত রোগে মারা গিয়েছিলেন জেন অস্টেন—আজও যা সাহিত্য জগতের ‘অন্যতম রহস্য’
ইংল্যান্ডের উইনচেস্টার কলেজের ক্যাম্পাসের পাশে ৮ নম্বর কলেজ স্ট্রিট—এই বাড়ির সামনে বহু বছর ধরে অনেকেই থমকে যান। ইটে তৈরি সাধারণ এই বাড়িটির বাইরের দেওয়ালে দরজার ওপরে থাকা ডিম্বাকৃতির একটি ফলক এর গুরুত্বের জানান দেয়। ফলকে লেখা: 'এই বাড়িতে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন জেন অস্টেন। ১৮১৭ সালের ১৮ জুলাই তিনি মারা যান।' তবে জেন অস্টেন ও তাঁর কাজের ভক্তদের (জেনাইট) কাছে এই স্থানটি লেখিকার স্বল্প আয়ুর জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়।
খ্যাতিমান এই ঔপন্যাসিক তাঁর বোন কাসান্দ্রা অস্টেনকে নিয়ে প্রায় আট সপ্তাহ এই ভবনের প্রথম তলায় বসবাস করেছিলেন। প্রায় এক বছর ধরে জেন অস্টেন এক অজ্ঞাত রোগে ভুগছিলেন, যার চিকিৎসার জন্যই তিনি উইনচেস্টারে আসেন। অসুস্থতা থেকে কিছুটা সেরে ওঠার লক্ষণ দেখা গেলেও, মাত্র ৪১ বছর বয়সে তিনি মারা যান। মজার ব্যাপার হলো, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কোনো স্পষ্ট রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পাননি, এমনকি আজও তা অজানা।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর জেন অস্টেনের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী। তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনো গবেষকদের আলোচনার বিষয়। গবেষকেরা অস্টেনের নিজের চিঠিতে লেখা উপসর্গের বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করে তাঁর স্বাস্থ্য সম্পর্কে বহু বছর ধরে একটি ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
শারীরিক প্রমাণ তেমন একটা না থাকায়, অস্টেনের লেখা চিঠি এবং উপন্যাসগুলোই গবেষকদের জন্য এক মূল্যবান দলিল। এর মধ্য দিয়ে তাঁর অসুস্থতার আগে না জানা বিষয়গুলো যেমন সামনে এসেছে, তেমনি তাঁর শেষের দিকের কাজ, যেমন—'পারসুয়েশন'–উপন্যাসের নতুন নতুন ব্যাখ্যাও বেরিয়ে আসছে।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা মত, নানা তত্ত্ব
১৯৬৪ সালে অধ্যাপক জ্যাকারির কোপ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা জেন অস্টেনের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে প্রথম নিবন্ধ। সেখানে বলা হয়েছিল, অস্টেন সম্ভবত অ্যাডিসন রোগ-এ মারা গেছেন। এটি একটি বিরল দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যেখানে শরীরের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলো প্রয়োজনীয় হরমোন যথেষ্ট পরিমাণে তৈরি করতে পারে না। পরবর্তী সময়ে গবেষকেরা পাকস্থলীর ক্যানসার, যক্ষ্মা বা হজকিন্স লিম্ফোমাকেও তাঁর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অনুমান করেন।
টেক্সাসের কার্ল আর ডার্নাল আর্মি মেডিকেল সেন্টারের অভ্যন্তরীণ মেডিসিন চিকিৎসক ডা. ডেসিয়া বয়েস জানান, রোগগুলো ভিন্ন হলেও এদের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে: চরম ক্লান্তি, ওজন হ্রাস, খাওয়ায় অরুচি এবং মাঝে মাঝে জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা বা রাতে ঘাম হওয়া।
অধ্যাপক লোজার বলেন, 'অ্যাডিসন রোগই তাঁর মৃত্যুর সবচেয়ে জনপ্রিয় উত্তর হিসেবে রয়ে গেছে, কারণ এই তত্ত্বটি বারবার আলোচিত হয়েছে। তবে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক একটি তত্ত্ব হলো, অস্টেন হয়তো লিম্ফোমার মতো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা ক্যানসারে মারা গিয়েছিলেন।'
তবে দুঃখজনক হলো, এর কোনো তত্ত্বই তাঁর অসুস্থতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারেনি, ফলে জেন অস্টেনের মৃত্যু রহস্য এখনো অমীমাংসিতই থেকে গেছে।
চিঠিপত্রে রোগের ইঙ্গিত
প্রয়াত নিউরো-অপথালমোলজিস্ট ড. মাইকেল ডি. স্যান্ডার্স ছিলেন জেন অস্টেনের কাজের একজন ভক্ত। তিনি অধ্যাপক কোপের বিশ্লেষণ পড়ার পর অস্টেনের রহস্যময় অসুস্থতা নিয়ে নিজস্ব গবেষণা শুরু করেন। স্যান্ডার্স দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে 'জেন অস্টেনস হাউস' জাদুঘরের কাছাকাছি বসবাস করেছেন।
স্যান্ডার্সের সহকর্মী ড. এলিজাবেথ গ্রাহাম বলেন, 'মাইকেল জেন অস্টেনকে খুব ভালোবাসতেন, তাই তিনি প্রায়ই ভাবতেন কেন তিনি মারা গেলেন। তিনি বিশেষভাবে ভাবিত ছিলেন যে অস্টেনের অস্থিসন্ধির সমস্যা ছিল, যা কিছুটা উপেক্ষিত হয়েছিল।'
অস্টেনের উপসর্গগুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করার জন্য স্যান্ডার্স ও গ্রাহাম তাঁর প্রতিটি চিঠি পর্যালোচনা করেন। তাঁদের গবেষণাটি ২০২১ সালের জানুয়ারিতে 'লুপাস' জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিতে অস্টেনের স্বাস্থ্যের অবনতির একটি বিস্তারিত কালানুক্রম তৈরি করা হয়েছে, যা সম্ভবত ১৮১৬ সালে শুরু হয়েছিল। তবে তাঁর চিঠিপত্রে সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট উপসর্গগুলো দেখা যায় ১৮১৬ সালের আগস্টের শেষে, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর ১১ মাস আগে।
জেন অস্টেনের সবচেয়ে সাধারণ অভিযোগ ছিল বাত (রিউমাটিজম), যার কারণে তিনি পিঠ ও হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করতেন। এছাড়াও তিনি ক্লান্তিতে ভোগা, জ্বর এবং মুখে ত্বকের বিবর্ণ ফুসকুড়ি দেখা যাওয়ার সমস্যায় ভুগতেন।
উপসর্গগুলো মাঝে মাঝে কমলেও সমস্যাগুলো বারবার ফিরে আসত। ১৮১৭ সালের মার্চে একটি চিঠিতে অস্টেন লেখেন, 'আমার এই বয়সে অসুস্থতা এক বিপজ্জনক আসক্তি।'
১৮১৭ সালের মে মাসে তাঁর চিকিৎসক তাঁকে উইনচেস্টারের কাউন্টি হাসপাতালের সার্জন জাইলস কিং লাইফোর্ডের কাছে পাঠান। গবেষক গ্রাহামের মতে, অস্টেন সে সময় লন্ডন ও উইনচেস্টারে উপযুক্ত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
৮ নম্বর কলেজ স্ট্রিট থেকে তিনি তাঁর এক ভাতিজা জেমস এডওয়ার্ড অস্টেন-লেইকে লেখেন, 'আমি ক্রমশ ভালো হয়ে উঠছি।' কিন্তু তাঁর এই শেষ দিনগুলো কাটানো বাড়ির দেয়ালের উদ্ধৃতিগুলো বোনদের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের পাশাপাশি জীবনের শেষ ও হারানোর বেদনাও বহন করে। এই বাড়িটি উইনচেস্টার কলেজের মালিকানাধীন এবং এটি দীর্ঘকাল ধরে অনুরাগীদের তীর্থযাত্রার একটি স্থান ছিল।
অস্টেনের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটে ১৮১৭ সালের জুন ও জুলাই মাসে। ১৫ জুলাই তিনি তাঁর শেষ কবিতা, 'ভেন্টা' কাসান্দ্রাকে বলে লেখান। মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়। ১৭ জুলাই তাঁর খিঁচুনি হয় এবং তিনি জ্ঞান হারান। কাসান্দ্রাকে তাঁর শেষ কথা ছিল: 'ঈশ্বর আমাকে ধৈর্য দিন, আমার জন্য প্রার্থনা করো, আমার জন্য প্রার্থনা করো!' পরের দিন ভোর সাড়ে ৪টায় কাসান্দ্রার কোলে মাথা রেখে তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যান।
জেন অস্টেনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো চিকিৎসা নথির সরাসরি প্রমাণ নেই। ফলে সে সময়ের চিকিৎসকেরা কী কারণ বলে মনে করতেন, তা আজও একটি খোলা প্রশ্ন।
স্যান্ডার্স ও গ্রাহাম অস্টেনের উপসর্গগুলো পর্যালোচনা করে অ্যাডিসন রোগ, যক্ষ্মা বা লিম্ফোমার সরাসরি কোনো প্রমাণ পাননি। অ্যাডিসন রোগে ত্বকের স্থায়ী বিবর্ণতা হয়, কিন্তু অস্টেনের ফুসকুড়ি ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং শুধুমাত্র মুখেই দেখা যেত। যক্ষ্মা হলে সাধারণত অস্থিসন্ধিতে বা বুকে অভিযোগ থাকে, যা তাঁর ছিল না। লিম্ফোমা হলেও লসিকা গ্রন্থি ফোলা বা বাতের সমস্যা থাকার কথা নয়।
গবেষক গ্রাহাম বলেন, 'তাঁর রোগটি যে হুট করে সেরে উঠছিল এবং আবার হুট করে বাড়ছিল, উচ্চ জ্বর ও ত্বকের ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছিল এবং মাঝে মাঝে তিনি সত্যিই সুস্থ বোধ করতেন, লিম্ফোমায় এমনটি হতো না।'
লুপাস রোগই কি মৃত্যুর আসল কারণ?
স্যান্ডার্স ও গ্রাহাম উভয়েই লুপাস বিশেষজ্ঞ ড. গ্রাহাম হিউজেসের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁরা অনুমান করেন, অস্টেন সম্ভবত সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমাটোসাস (এসএলই) রোগে ভুগছিলেন। এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যা সাধারণত অস্থিসন্ধির সমস্যা, মুখের ত্বকের পরিবর্তন, জ্বর ও ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত। অস্টেনের মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পর রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল এবং এই রোগটি ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মহিলাদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
চুলের নমুনা পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ জানার একটি সুযোগ ছিল। বিথোভেনের চুলের ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অস্টেনের চুলের গোড়া (ফলিকল) না থাকায় ডিএনএ পরীক্ষা ফলপ্রসূ হবে না বলে গবেষকেরা নমুনাটি পরীক্ষার অনুরোধ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
'জেন অস্টেনস হাউস'-এর পরিচালক লিজি ডানফোর্ড জানান, জাদুঘরে থাকা অস্টেনের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি চুলের গোছাও দূষিত হয়েছে। তিনি বলেন, 'এই গবেষণার ভিত্তিতে আমরা বুঝতে পারছি, চুলের নমুনাগুলোর আরও বিশ্লেষণ সম্ভবত অস্টেনের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে কোনো প্রশ্নের সমাধান করতে পারবে না। এটি হয়তো সাহিত্যের এক বিশাল রহস্য হিসেবেই থেকে যেতে পারে।'
উইনচেস্টার কলেজের সংগ্রাহক রিচার্ড ফস্টার বলেন, 'আমরা নিশ্চিত যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য নেই।'
তবে অস্টেনের অসুস্থতা বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা তাঁর জীবন ও সাহিত্যের নতুন দিক উন্মোচন করছে। তাঁর শেষ কাজগুলোতে স্বাস্থ্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। তাঁর 'পারসুয়েশন' উপন্যাসে অসুস্থতা ও আঘাতের উপস্থিতি দেখা যায় এবং 'স্যান্ডিটনে' রোগমুক্তির খোঁজ রয়েছে।
অ্যারিজোনা স্টেটের অধ্যাপক লোজার বলেন, 'অনেকেই হয়তো আত্ম-করুণা ও ব্যথায় নিজেদের গুটিয়ে নিতাম। কিন্তু তিনি যে খুব মজাদার সব চরিত্র তৈরি করতে পেরেছিলেন, যা এক অর্থে তাঁর নিজের অসুস্থতারই উপহাস, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য।'
অস্টেন তাঁর বিভিন্ন লেখায় শক্তি ও দুর্বলতার প্রশ্নটি অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর উপন্যাসজুড়ে অসুস্থতার উল্লেখ খুব সাধারণ। তাঁর চরিত্রগুলো স্নায়বিক সমস্যা, মাথাব্যথা, জ্বর ও স্বাস্থ্য-উদ্বেগে ভুগে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে উঠত।
অধ্যাপক ফস্টার বলেন, 'আমি মনে করি এটি এই ধারণাকেই জোরালো করে যে পারিবারিক সম্পর্কই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুর সময় তিনি তাঁর প্রিয়জনদের সঙ্গে ছিলেন। এক অর্থে তিনি বিদায় জানানোর সুযোগ পেয়েছিলেন।'
