নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যেভাবে রুশ তেল কেনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে ভারত
আমেরিকা ও ইউরোপ একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে রাশিয়ার বড় বড় তেল কোম্পানির ওপর। কিন্তু ভারত এসবের তোয়াক্কা করছে না। সস্তায় অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল কেনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে দেশটি।
গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সম্মেলনে মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সেখানে পুতিন সাফ জানিয়ে দেন, "রাশিয়া ভারতে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।"
চীনের পরেই রাশিয়ার তেলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা এখন ভারত। আমেরিকা অবশ্য বিষয়টি ভালোভাবে দেখছে না। তারা ভারতকে তেল কেনা থামাতে প্রচণ্ড চাপ দিচ্ছে। এই বছরের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করেছে। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, তেলের বিষয়টি এর অন্যতম কারণ।
এত চাপ আর নিষেধাজ্ঞার পরেও নয়াদিল্লি কীভাবে মস্কো থেকে তেল কেনা চালিয়ে যাচ্ছে? চলুন জানা যাক এর পেছনের গল্প।
ভারত কীভাবে এত বড় ক্রেতা হলো?
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পুরোদমে হামলা চালায় রাশিয়া। এর আগে, ২০২১ সালে ভারতের মোট আমদানি করা তেলের মাত্র ২.৫ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে।
যুদ্ধ শুরুর পর মস্কোকে একঘরে করতে ইউরোপ ও আমেরিকা উঠেপড়ে লাগে। জ্বালানি, বিমান চলাচল থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে ২১ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
কিন্তু আসল খেলাটা শুরু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। রাশিয়ার আয়ের পথ বন্ধ করতে জি-সেভেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়া রাশিয়ার তেলের দাম ব্যারেলে ৬০ ডলার বেঁধে দেয়। পরে এটি আরও কমানো হয়। ফলে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোর কাছে রাশিয়ার তেল খুব লোভনীয় হয়ে ওঠে। রাশিয়া ভারতকে পানির দরে তেল দিতে থাকে। ২০২২ সালের মার্চে এই দাম ব্যারেল প্রতি ৩৫ ডলারেও নেমেছিল।
অথচ বর্তমানে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৬২.৫০ ডলার।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারত রাশিয়া থেকে রেকর্ড ৫.৮ বিলিয়ন ডলারের তেল কিনেছে।
তবে ওই মাসের শেষেই আমেরিকা নতুন করে রাশিয়ার শত শত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এর মধ্যে রাশিয়ার তেলের জাহাজ ও ব্যবসায়ীরাও ছিলেন। ফলে নভেম্বরে আমদানি কমে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে এবং ডিসেম্বরে ৩.২ বিলিয়ন ডলারে নামে।
কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেই চিত্র আবার বদলে যায়। আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৬ বিলিয়ন ডলারে। এরপর থেকে আমদানির পরিমাণ ওঠানামা করছে।
গত আগস্টে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, ভারতের কেনা তেলের টাকায় রাশিয়া যুদ্ধ চালাচ্ছে। এটি বন্ধ হওয়া দরকার। শাস্তি হিসেবে ওয়াশিংটন ভারতীয় পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে দেয়।
অক্টোবরে ট্রাম্প দাবি করেন, মোদি তাকে কথা দিয়েছেন যে ভারত আর রাশিয়া থেকে তেল কিনবে না। তিনি বলেন, "আমি খুশি ছিলাম না। মোদি আমাকে কথা দিয়েছেন। এবার চীনকেও একই কাজ করতে হবে।"
কিন্তু গত ৪ ডিসেম্বর দিল্লিতে পুতিন ট্রাম্পের এই দাবি উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, "আমেরিকা নিজেই তো নিজের পারমাণবিক কেন্দ্রের জন্য আমাদের থেকে জ্বালানি কিনছে।" তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে আমেরিকা রাশিয়া থেকে রেকর্ড ১.২ বিলিয়ন ডলারের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনেছে। পুতিনের যুক্তি, আমেরিকা কিনতে পারলে ভারতেরও সেই অধিকার থাকা উচিত।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও বলেছেন, ভারত একটি স্বাধীন দেশ এবং তারা নিজেদের লাভ বুঝেই ব্যবসা করবে।
নিষেধাজ্ঞার ভয়েই কি আমদানি বাড়ল?
গত ২২ অক্টোবর ট্রাম্প রাশিয়ার দুই বৃহত্তম তেল কোম্পানি—রোজনেফ্ট এবং লুকোয়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। এই নিয়ম ২১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল।
এই সময়ের সুযোগটিই নিয়েছে ভারত। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই ভারতীয় রিফাইনারি বা শোধনাগারগুলো দ্রুত তেল কিনে মজুদ বাড়াতে শুরু করে। নভেম্বরের শুরুতে ভারত দিনে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে, যা ছিল একটি রেকর্ড।
ভারতের তেল শোধনাগারগুলো মূলত তিন ধরনের। সরকারি কোম্পানি, রিলায়েন্সের মতো বেসরকারি কোম্পানি এবং নায়ারা এনার্জি। নায়ারা এনার্জির মালিকানায় রাশিয়ার বড় অংশ আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নায়ারা শুধু রাশিয়ার তেল কেনাতেই মনোযোগ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভারতের তেল কেনা কিছুটা কমানো গেলেও পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
ভারতের কেনা রুশ তেলের ৬০ শতাংশই আসে রোজনেফ্ট এবং লুকোয়েল থেকে। এখন যেহেতু এদের ওপর কড়াকড়ি, তাই ভারতকে বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে।
ভারত সম্ভবত এখন 'সুরগুতনেফতেগ্যাস'-এর মতো কোম্পানির দিকে ঝুঁকবে। কারণ এই কোম্পানিগুলোর ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা নেই। এছাড়া 'গাজপ্রম নেফ্ট' থেকেও তেল কেনা হতে পারে। এদের ওপর কিছু বিধিনিষেধ থাকলেও ব্যবসা পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়।
আরেকটি বড় উপায় হলো 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়াতরী ব্যবহার করা। এগুলো হলো পুরোনো ট্যাঙ্কার জাহাজ, যা পশ্চিমা বীমা বা পতাকা ব্যবহার করে না। ফলে এদের মাধ্যমে গোপনে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল আনা সম্ভব।
গবেষণা বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারত ভুয়া পতাকাবাহী ৩০টি জাহাজের মাধ্যমে ৫৪ লাখ টন রুশ তেল আমদানি করেছে।
