ডায়েট সোডা ও কোমল পানীয় লিভারের রোগের ঝুঁকি ৬০% পর্যন্ত বাড়াতে পারে: গবেষণা
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, প্রতিদিন মাত্র এক ক্যান ডায়েট সোডা পান করলেও অ্যালকোহলবিহীন ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) হওয়ার ঝুঁকি ৬০% পর্যন্ত বাড়তে পারে। এছাড়া চিনিযুক্ত কোমল পানীয় গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
ইউরোপীয় সোসাইটি অব গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল এন্ডোস্কপির বার্ষিক সম্মেলন 'ইউনাইটেড ইউরোপিয়ান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি উইক'-এ সোমবার বার্লিনে এই গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়।
অ্যালকোহলবিহীন ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা এনএএফএলডি'র রোগের ক্ষেত্রে মদ্যপান না করা বা খুব কম অ্যালকোহল গ্রহণকারী মানুষের লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এ কারণে অতিরিক্ত মদ্যপানের মতোই হতে লিভারের ক্ষতি পারে। এ ধরনের ক্ষতি সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
অ্যালকোহলবিহীন ফ্যাটি লিভার ডিজিজ বা মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (এমএএসএলডি) বর্তমানে লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন দশকে এনএএফএলডির হার প্রায় ৫০% বেড়েছে, বর্তমানে দেশটির প্রায় ৩৮% মানুষ এই রোগে আক্রান্ত।
চীনের সুঝো শহরের সুঝো ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের গবেষক ও গবেষণার প্রধান লেখক লি হে লিউ বলেন, 'চিনিযুক্ত পানীয় (এসএসবি) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে, তবে ডায়েট বিকল্পগুলো সাধারণত স্বাস্থ্যসম্মত বলে মনে করা হয়।'
তিনি জানান, 'আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন মাত্র এক ক্যান চিনিমুক্ত পানীয় (এলএনএসএসবি) পানও এমএএসএলডির ঝুঁকি অনেক বাড়াতে পারে।'
গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ডায়েট পানীয় গ্রহণকারীদের মধ্যে লিভারজনিত মৃত্যুঝুঁকিও বেশি দেখা গেছে।
লিউ বলেন, 'এই ফলাফলগুলো দেখায়, সাধারণত বিশ্বাস করা হয় এসব পানীয় ক্ষতিকর নয়, তবে এটি ভুল। তাই ডায়েট ও লিভারস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এসব পানীয়ের প্রভাব নতুনভাবে বিবেচনা করা জরুরি, বিশেষ করে যখন এমএএসএলডি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।'
ডায়েট ও চিনিযুক্ত পানীয় লিভারে কীভাবে প্রভাব ফেলে
গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ১ লাখ ২৪ হাজারের কাছাকাছি অংশগ্রহণকারীর খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করা হয়, যাদের লিভারের কোনো রোগ ছিল না। ১০ বছরব্যাপী এই গবেষণায় ২৪ ঘণ্টার খাদ্য প্রশ্নমালা ব্যবহার করে পানীয়ের ধরন ও গ্রহণের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেখা গেছে, যারা চিনিযুক্ত বা ডায়েট সোডার পরিবর্তে পানি পান করেছেন, তাদের লিভারের রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—চিনিযুক্ত পানীয়ের ক্ষেত্রে ১৩% এবং ডায়েট পানীয়ের ক্ষেত্রে ১৫% পর্যন্ত। তবে এক ধরনের সফট ড্রিংক বদলে থেকে অন্য ধরনের ড্রিংকে পরিবর্তন আনলে ঝুঁকিতে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন স্কুলের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজির ক্লিনিক্যাল সহযোগী অধ্যাপক সাজিদ জালিল বলেন, এই গবেষণা প্রমাণ করেছে খাদ্যাভ্যাস সরাসরি এমএএসএলডিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি আগের কিছু বিশ্লেষণকে ভুল প্রমাণ করেছে, যেগুলোতে ডায়েট পানীয়কে পানির বিকল্প হিসেবে ধরা হয়েছিল।
জালিল ই-মেইলে জানান, 'গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ও ডায়েট উভয় ধরনের সফট ড্রিংকই দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি করতে পারে। অন্যদিকে পানি বা চিনিমুক্ত পানীয় লিভারকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে।'
তিনি বলেন, 'আমার কাছে এই গবেষণা আগের যেকোনো গবেষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি, বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণকারী এবং যাচাই করা পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।'
কেন চিনিযুক্ত ও ডায়েট পানীয় লিভারে এমন প্রভাব ফেলে?
লিউ বলেন, চিনিযুক্ত পানীয়ে থাকা উচ্চমাত্রার চিনি রক্তে গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা ওজন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত চিনি লিভারে চর্বি জমাতেও সহায়তা করে।
অন্যদিকে, ক্যালরিতে কম হলেও ডায়েট পানীয়ও লিভারের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, 'ডায়েট পানীয় অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন করে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে বাধা দেয়, মিষ্টি খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ায় এবং ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়াতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু পানি শরীরকে হাইড্রেট রাখে, বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখে, পরিতৃপ্তি বাড়ায় এবং সামগ্রিকভাবে মেটাবলিক স্বাস্থ্যে সহায়তা করে। তাই যে পানীয়ই হোক, তার বদলে পানি পান করলে ঝুঁকি অনেক কমে। এটি প্রমাণ করে যে পানি-ই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর পানীয়।'
