ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি: এই পদক্ষেপের তাৎপর্য কী, বাস্তবতা কতটুক বদলাবে?
ইসরায়েলের তীব্র আপত্তি ও হুমকি উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে হাঁটছে যুক্তরাজ্য ও পর্তুগাল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনের ঠিক আগে আজ রোববার দেশ দুটি এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেবে বলে জানিয়েছে এএফপি। এছাড়াও, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী দেশও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে।
এই ঘোষণার পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত হামাসের 'নৃশংস সন্ত্রাসবাদকে' পুরস্কৃত করার শামিল। যুক্তরাষ্ট্রও এই পদক্ষেপের কঠোর বিরোধিতা করেছে।
যদিও এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে, ফিলিস্তিনকে দেওয়া এই স্বীকৃতির প্রকৃত অর্থ কী? এর মাধ্যমে দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের বাস্তবতায় কতটা পরিবর্তন আসবে?
স্বীকৃতির অর্থ কী?
ফিলিস্তিন এমন এক রাষ্ট্র, যার অস্তিত্ব আছে, আবার নেইও। বিশ্বের বহু দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, বিভিন্ন দেশে তাদের কূটনৈতিক মিশনও রয়েছে। এমনকি অলিম্পিকের মতো বড় ক্রীড়া আসরেও ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ে।
কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনের কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী কিংবা সেনাবাহিনী নেই। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক দখলদারিত্বের কারণে ১৯৯০-এর দশকে শান্তি চুক্তির পর প্রতিষ্ঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও নিজেদের ভূমি বা জনগণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে গাজা উপত্যকায় চলছে ভয়াবহ যুদ্ধ।
এই আধা-রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নৈতিক বার্তা দেওয়া সম্ভব হলেও, মাঠের পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসবে না।
তবে এই প্রতীকী পদক্ষেপের গুরুত্বও কম নয়। যেমনটি যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জুলাই মাসে জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে বলেছিলেন, 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে।'
ল্যামি তার বক্তব্যে ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার কথা তুলে ধরেন, যেখানে ব্রিটিশ সরকার প্রথম ফিলিস্তিনে 'ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাস' প্রতিষ্ঠায় সমর্থন জানিয়েছিল। তবে ল্যামি মনে করিয়ে দেন, সেই ঘোষণার সঙ্গে একটি জোরালো প্রতিশ্রুতিও ছিল: 'ফিলিস্তিনে বসবাসরত অ-ইহুদি জনগোষ্ঠীর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।'
তবে ইসরায়েলের সমর্থকেরা প্রায়ই বলে থাকেন যে, লর্ড বেলফোর তার ঘোষণায় সুনির্দিষ্টভাবে ফিলিস্তিনিদের কথা বা তাদের জাতীয় অধিকারের বিষয়ে কিছু বলেননি।
কিন্তু যে ভূখণ্ডটি আগে ফিলিস্তিন নামে পরিচিত ছিল এবং যা ১৯২২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত লিগ অব নেশনসের ম্যান্ডেটে ব্রিটেনের অধীনে ছিল, সেটি দীর্ঘকাল ধরেই একটি অমীমাংসিত আন্তর্জাতিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, নানা কারণে একটি পৃথক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
ডেভিড ল্যামির ভাষায়, রাজনীতিবিদরা এখন 'দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান' কথাটি বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এই সমাধানের মূল কথা হলো, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগের সীমানা অনুযায়ী পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা হবে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। ওই যুদ্ধের পর থেকেই পূর্ব জেরুজালেম ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
কিন্তু দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের সব আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ হলেও, পশ্চিম তীরের বিশাল অংশজুড়ে ইসরায়েলের বসতি স্থাপন এই ধারণাটিকে একটি অন্তঃসারশূন্য স্লোগানে পরিণত করেছে।
কারা দিচ্ছে স্বীকৃতি?
বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের মর্যাদা 'স্থায়ী পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র' হিসেবে, যা তাদের বিভিন্ন আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলেও ভোটাধিকার দেয় না।
এবার যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশের পাশাপাশি কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম ও মাল্টার মতো দেশগুলোও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মধ্যে চারটি—যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া—ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়াবে।
চীন ও রাশিয়া ১৯৮৮ সালেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এর ফলে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্র কার্যত একা হয়ে পড়বে।
এখন কেন এই পদক্ষেপ?
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়, বিশ্বজুড়ে জনমতের চাপ এবং ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ পশ্চিমা দেশগুলোকে তাদের পুরোনো অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে। এতদিন ধরে যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ বলে আসছিল, শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবেই তারা স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন।
তবে কয়েকটি দেশ শর্ত জুড়ে দিয়েছে। যেমন, কানাডা বলেছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সংস্কার করতে হবে, ২০২৬ সালে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।
অন্যদিকে, অন্যদিকে, ব্রিটিশ সরকার তাদের সিদ্ধান্তের জন্য ইসরায়েলের ওপরই দায় চাপিয়েছে।যুক্তরাজ্য বলেছে, ইসরায়েল যদি গাজায় যুদ্ধবিরতি, পশ্চিম তীরে ভূমি দখল বন্ধ এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে না হাঁটে, তবে তারা স্বীকৃতি দেবে। সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের কাছ থেকে এসব শর্ত পূরণের সম্ভাবনা কম, তাই স্বীকৃতি দেওয়া প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
সমন্বিত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশগুলো গাজার যুদ্ধ বন্ধ এবং একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়ে বরাবরই বিরোধিতা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে তাদের বিরোধিতার কথা কখনোই গোপন করেনি। বৃহস্পতিবার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই স্বীকার করেছেন যে, 'এই বিষয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার মতবিরোধ রয়েছে।' তবে দুই নেতা জানিয়েছেন, তাদের একান্ত বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এই স্বীকৃতি হামাসকে 'আরও উৎসাহিত করবে।' ইসরায়েলের সুরে সুর মিলিয়ে তিনিও বলেন, এটি 'সন্ত্রাসবাদের জন্য পুরস্কার' ছাড়া আর কিছুই নয়।
রুবিও এমনকি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই পদক্ষেপ ইসরায়েলকে পশ্চিম তীরকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত করে নিতে উসকে দিতে পারে, যা গাজায় যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলবে।
