পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির প্রাণী কোনটি?
দ্রুত গতিশীল প্রাণীরা তাদের অসাধারণ গতির জন্য অনেক মনোযোগ পান। কিন্তু যারা ধীরগতিতে চলে, তাদের ব্যাপারে কী বলা যায়?
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সিনিয়র ফিশ কিউরেটর জেমস ম্যাক্লেইন এ বিষয়ে বলেন, 'আমরা নিশ্চিতভাবে প্রোগ্রামড হয়েছি ভাবতে যে গতি ভালো। অনেক প্রাণীর জন্য, এই ধারণার কোনো মানে নেই।'
তাহলে, পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির প্রাণী কোনটি? এবং তারা কীভাবে বেঁচে থাকে যখন আপনি ধারণা করেন যে গতি আপনার দক্ষতার অংশ নয়?
ধীরগতির সামুদ্রিক প্রাণীরা
এগুলো সাধারণ প্রশ্নের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু গতি বিভিন্নভাবে পরিমাপ করা যায়। প্রাণীদের গতিকে বোঝার এবং তুলনা করার একটি উপায় হল একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে তাদের কত সময় লাগে তা দেখা।
এই দিক দিয়ে, সবচেয়ে ধীরগতির প্রাণী হতে পারে সমুদ্রের অ্যানিমোনি, যা প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি (১০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার) ক্রমে সরতে পারে (প্রায় ০.০০০০৬ থেকে ০.০০০১৫ মাইল প্রতি ঘণ্টা), সাধারণত তখনই যখন এটি নতুন আবাসস্থানের খোঁজে থাকে; অন্য সময় এটি স্থির থাকে।
মূলত এই স্থির প্রাণীটি থেকে বেশ একটু দূরেই রয়েছে বামনাকৃতির সি হর্স। এটি বিশ্বে সবচেয়ে ধীরগতির মাছ এবং সবচেয়ে ধীর প্রাণীদের মধ্যে একটি হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত।
এর ধীরগতির একটি কারণ হল এর উলম্ব ভাসমান অবস্থান এবং ছোট ডর্সাল ফিন, যা এই সি হর্সকে পানিতে খুব শক্তিশালীভাবে এগোতে সাহায্য করে না। জেমস ম্যাক্লেইন লাইভ সায়েন্স-কে বলেন, এটির ১.৫ মিটার (৫ ফুট) অতিক্রম করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে।
তবে এই ধীরগতি সি হর্সের জন্য বেশ সুবিধাজনক। প্রাণীটি তার দীর্ঘ লম্বা লেজ দিয়ে সামুদ্রিক ঘাসের সঙ্গে আটকে থাকে এবং পাশ দিয়ে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্রাস্টেসিয়ান খায়। ম্যাক্লেইন বলেন, 'খাদ্য এটি নিজেই পায়, তাই দ্রুত হওয়ার প্রয়োজন নেই।' আরও গুরুত্বপূর্ণ, এদের অনেক শত্রু নেই, কারণ এরা প্রতিরক্ষামূলক হাড়ের প্লেট দিয়ে সুরক্ষিত, তাই পালানোর প্রয়োজনও নেই।
জেমস ম্যাক্লেইন বলেন, এই সি হর্সগুলো মাত্র তখনই তাদের গতি বাড়ায় যখন তারা প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়। 'এটি সত্যিই বিশেষ, কারণ এরা একে অপরের সঙ্গে নাচে এবং একে অপরের সঙ্গে গতি সমন্বিত করে।।
তিনি জানান, এই নৃত্যশৈলী কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। আর প্রজননে সময় নাচের মধ্যেই সি হর্স মূলত চলাফেরা করে।
সমুদ্রের গভীরতর স্তরে, গ্রিনল্যান্ড শার্ক হলো একটি শীতলজলীয় দৈত্য যা ২৪ ফুট (৭.৩ মিটার) পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই প্রাচীন প্রাণী অত্যন্ত ধীরগতিতে মাত্র ২ মাইল প্রতি ঘণ্টা (৩ কিমি/ঘণ্টা) গতিতে ভাসমান থাকে। গ্রিনল্যান্ড শার্ক ঠান্ডা জলে বসবাস করে এবং মৃত সামুদ্রিক প্রাণীর উপর নির্ভরশীল। ম্যাক্লেইন বলেন, 'এর জন্য দ্রুত চলার দরকার নেই, তাই এটি খুব ধীরে চলে।'
স্থলভাগে চলাফেরা
স্থলে সবচেয়ে ধীরগতির প্রাণী সম্ভবত ব্যানানা স্লাগ, যা অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘণ্টায় মাত্র ০.০০৬ মাইল (০.০০৯৬ কিমি) গতিতে চলে, বলছিলেন লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মলাস্ক বিষয়ক বিভাগের সিনিয়র কিউরেটর জন অ্যাবলেট।
অ্যাবলেট বলেন, যদিও প্রাণীর গতির সঠিক হিসাব বের করা কঠিন। তারপরও মলাস্ক অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় বেশ দীরগতির। কিছু মলাস্ক প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মোটেও চলাফেরা করে না, আর কিছু বাইভ্যালভ স্থায়ীভাবেই স্থির থাকে।'
তিনি আরও বলেন, 'এই প্রাণীগুলো ছোট হওয়ার কারণে আস্তে চলাফেরা করে না। উদাহরণস্বরূপ, পোকা, মাকড়সা বা পিঁপড়ের মতো অন্যান্য ছোট প্রাণীরা প্রায়ই স্লাগ বা স্নেইলের চেয়েও ছোট, কিন্তু অনেক দ্রুত চলতে পারে।'
অ্যাবলেট বলেন, তারপরও, মলাস্ক প্রজাতির প্রাণীতেও গতির ভিন্নতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাধারণ গার্ডেন স্নেইল আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত ঘণ্টায় ০.০৩ মাইল (০.০৪৮ কিমি) গতিতে চলে।
স্থলভাগের অন্যান্য ধীর গতির প্রাণীর মধ্যে রয়েছে গ্যালাপাগোসের দৈত্যাকৃতির কচ্ছপ। এ সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণীটির মধ্যেও গতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং এর ছোট দূরত্ব অতিক্রম করতেও অনেক সময় লাগে। এই সরীসৃপগুলো প্রায় ০.১৬ মাইল প্রতি ঘণ্টা (০.২৬ কিমি/ঘণ্টা) গতিতে ধীরে ধীরে চলে। তুলনামূলকভাবে, একই আকারের মানুষ প্রায় ২.৮ মাইল প্রতি ঘণ্টা (৪.৫ কিমি/ঘণ্টা) গতিতে হাঁটে।
এদিকে, গাছের মধ্যে বসবাসকারী স্তন্যপায়ীরা বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির প্রাণীর মধ্যে অন্যতম। স্লো লরিস হলো ছোট আকৃতির কিছু প্রাইমেট, যাদের নামের মতোই তারা গাছে ধীরে, মনোযোগীভাবে চলে। এরা চারপাশ পর্যবেক্ষণ করতে বড় বড় চোখ ব্যবহার করে সতর্কভাবে চলাফেরা করে। যদিও এরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল থাকতে পারে, তবে চলার সময় এদের গতি প্রায় ১.১ মাইল প্রতি ঘণ্টা (১.৮ কিমি/ঘণ্টা)।
গতি এবং আকার
গতিকে পরিমাপ করার আরেকটি উপায় রয়েছে, যা হলো শরীরের আকারকে হিসাব করা। কিছু জীববিজ্ঞানী মনে করেন, প্রাণীর গতিকে তুলনা করার সবচেয়ে সঠিক উপায় হলো এটি। উদাহরণস্বরূপ, একটি মানুষ এক সেকেন্ডে একটি পিঁপড়ের চেয়ে অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তবে পিঁপড়ের ছোট দেহ বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি নিজের দেহের আকারের তুলনায় অনেক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করছে, অর্থাৎ আকারের অনুপাতে এটি অনেক দ্রুত চলছে।
প্রাণীর গতির পরিসরও বিশ্বের সবচেয়ে ধীর প্রাণী নির্ধারণের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বলেছেন ওয়েলসের সুয়ানসি ইউনিভার্সিটির জলজ জীববিদ্যা ও টেকসই অ্যাকোয়াকালচারের অধ্যাপক রোরি উইলসন। উদাহরণস্বরূপ, কিছু সাপ প্রায় অদৃশ্যভাবে ধীরে চলে, কিন্তু শিকার ধরার সময় হঠাৎ দ্রুত আক্রমণ করতে পারে।
এই বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনা করে, উইলসন মনে করেন বিশ্বের সবচেয়ে ধীর প্রাণীর খেতাবের জন্য তিন আঙুলের স্লথের সাথে আর কারও তুলনা হতে পারে না।
রোরি উইলসন লাইভ সায়েন্স-কে বলেন, 'যিনি প্রাণীর চলাফেরার সর্বাত্মক দিক নিয়ে গবেষণা করেন—শুধু একটি গাছ থেকে অন্য গাছে যাওয়া নয়, বরং উদ্দীপনার প্রতিক্রিয়ায় চলাফেরার গতি পর্যন্ত—তার দৃষ্টিকোণ থেকে তিন আঙুলের স্লথ কতটা ধীর তা সত্যিই চমকপ্রদ।'
এই প্রাণীরা প্রায় প্রতি ঘণ্টায় ১ মাইল (১.৬ কিমি/ঘণ্টা) বেগে চলতে পারে, তবে বেশিরভাগ হিসাব অনুযায়ী এরা সাধারণত মাত্র কয়েক মিটার অতিক্রম করে শুধু।
তাদের খুব ছোট দূরত্ব অতিক্রম করতেও অনেক সময় লাগে এবং তাদের সমস্ত চলাফেরা অতি ধীর, ধীরে ধীরে হয়, এজন্য স্লথরা বিশ্বের সবচেয়ে ধীর প্রাণীর খেতাবের যোগ্য। উইলসন বলেন, 'যখন আমি প্রথম বন্য স্লথ দেখেছি, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি যে এগুলো কত ধীরে চলছে। সবকিছু যেন তাই চি-এর মতো।'
অন্যান্য অনেক ধীরগতির প্রাণীর মতো, স্লথদেরও তাদের ধীরগতির কারণে বেঁচে থাকার জন্য বিশেষ অভিযোজন দরকার।
স্লথরা শত্রুদের চোখে পড়লে পালানোর ক্ষমতা রাখে না, তাই তারা ছদ্মবেশে বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছে—তাদের ধীর চলাফেরা এবং রঙ তাদের গাছে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে, যাতে শিকারিরা সহজে তাদের দেখতে না পায়।
সাথে সাথে, স্লথরা অত্যন্ত শক্তিশালী, মানুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ শক্তিশালী। এই শক্তি তাদের গাছে স্থিতিশীলভাবে ঝুলতে সাহায্য করে, যেখানে তাড়াতাড়ি চলাফেরা বা চটপটে হওয়ার ক্ষমতা তাদেরকে নিরাপদে রাখতে সাহায্য করতে পারত।
স্লথদের ধীরগতির জীবনযাপন তাদের মেটাবলিজম এবং শক্তি ব্যবহারের দক্ষতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্লথদের মেটাবলিজম ধীর। এর কারণে কম-শক্তিযুক্ত খাবার, মূলত পাতা, খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাদের খাদ্য হজম হতে কয়েক দিন লাগতে পারে, এবং তারা শুধু সপ্তাহে একবার বৃক্ষ থেকে নামেন মলত্যাগের জন্য।
রোরি উইলসন বলেন, 'প্রশ্ন হলো, তারা এত ধীর কেন? এতে তাদের কী লাভ হয়?' সহজ উত্তর হলো, দ্রুত চলার জন্য শক্তি প্রয়োজন, আর শক্তির জন্য শক্তির উৎস অর্থাৎ এনার্জি দরকার, যা সংগ্রহ করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল। স্লথরা খুব কম খাদ্য খেয়ে এবং ধীর গতিতে চলা দ্বারা এনার্জি চাহিদা পূরণ করতে পারে। তাদের ধীর গতির জীবনধারা এবং শক্তি ব্যবহারের এই সামঞ্জস্য একেবারেই সঠিকভাবে কাজ করে।
উইলসন বলেন, 'যদি আপনার পুরো জীবনধারা হয় যে আমি ধীরে চলছি, তাই বেশি খাওয়ার দরকার নেই, আমি কম-গুণমানের খাবার খেতে পারি যাতে কয়েক দিনে হজম করতে পারি এবং সব ঠিক আছে কারণ আমি খুব ধীর—তাই সবই চমৎকারভাবে মিলে যায়।'
