ভবিষ্যতের বিড়াল দেখতে কেমন হবে?
মাত্র ১০ হাজার বছরের মধ্যে বিড়াল বন্য পরিবেশ ছেড়ে মানুষের সঙ্গে ঘরবাড়িতে বাস করতে শুরু করেছে। মানুষ যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়, দেশ থেকে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছে; বিড়ালও তাদের সঙ্গে ঘুরেছে। তবে বিড়াল প্রজাতির উদ্ভব মানুষের আগমনের বহু আগেই, প্রায় ৩৭ মিলিয়ন বছর আগে।
তবে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের সংস্পর্শে থাকলেও বিড়ালের প্রজননের সময় ও সঙ্গী নির্বাচনে মানুষের প্রভাব তেমন পড়েনি।
দেহগঠনের দিক থেকেও গৃহপালিত বিড়ালদের সঙ্গে বন্য প্রজাতির খুব বেশি পার্থক্য নেই।
অধিকাংশ গৃহপালিত বিড়াল প্রজাতির বয়স ২০০ বছরেরও কম এবং আকার ও গঠনে এরা প্রায় অভিন্ন। অর্থাৎ বিড়ালের গৃহপালিত হওয়া (ডোমেস্টিকেশন) আসলে খুব সাম্প্রতিক একটি ঘটনা।
প্রজাতিভেদে ভিন্নতা
সম্প্রতি কিছু নতুন বিড়ালের জাত (ব্রিড) তৈরি হয়েছে। যেমন- র্যাগডল, বারম্যান, কোঁকড়াচুলের কর্নিশ রেক্স ও লোমহীন স্পিঙ্ক্স প্রভৃতি জাতের বিড়াল দেখা যায়।
এর বাইরে পার্সিয়ান বিড়ালের মতো কিছু জাত তুলনামূলকভাবে পুরনো। তাদের উৎপত্তির ইতিহাস ১৬০০ সালের মধ্যপ্রাচ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। তবে, তা সত্ত্বেও পার্সিয়ানদের ইতিহাস অনেক কুকুর প্রজাতির তুলনায় অনেক নতুন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুকুরের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে স্বভাব ও আচরণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। যেমন- শিকার প্রবণতা বেশি, কেউ আবার খুবই রুক্ষ্ম প্রকৃতির প্রভৃতি। তবে বিড়ালের ক্ষেত্রে এমনটা তেমন দেখা যায় না। বেশিরভাগ বিড়ালের জাতের মধ্যে পার্থক্য মূলত চেহারায়, স্বভাবে বা আকৃতিতে নয়।
বিড়ালের নতুন নতুন জাত এখনো তৈরি করা হচ্ছে, এমনকি বন্য বিড়াল আর গৃহপালিত বিড়ালের সংকর জাতও। যেমন- বেঙ্গল প্রজাতি এসেছে এশিয়ান চিতা বিড়াল ও গৃহপালিত বিড়ালের সংকরায়ন থেকে। সাভানাহ প্রজাতি এসেছে আফ্রিকান সার্ভাল ও গৃহপালিত বিড়ালের সংমিশ্রণে।
ভবিষ্যতের বিড়াল
আজ থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে ইউরোপে বিড়াল ব্যবহার করা হতো ইঁদুর ধরার কাজে এবং তাদের লোম বা চামড়া থেকে পশম সংগ্রহের জন্য।
একদল স্ক্যান্ডিনেভিয়ান পুরাতত্ত্ববিদ ভাইকিং যুগের বিড়ালের চামড়ার আকারের সঙ্গে আধুনিক বিড়ালের শরীরের তুলনা করে দেখেছেন যে, একবিংশ শতাব্দীর বিড়াল পুরনো সময়ের চেয়ে গড়ে ১৬ শতাংশ বড়।
এই ফলাফলটি বেশ চমকপ্রদ, কারণ গৃহপালিতকরণের ফলে সাধারণত প্রাণীর আকার ছোট হয়ে যায়। যেমন- কুকুর তার পূর্বপুরুষ নেকড়ের চেয়ে প্রায় ২৫% ছোট; গরু, ছাগল, ভেড়ার মতো গৃহপালিত পশুও বন্য পূর্বপুরুষদের তুলনায় আকারে ছোট।
শুধু পুষ্টিসমৃদ্ধ প্যাকেটজাত খাবারের সহজলভ্যতাই বিড়ালদের আকারে বড় হওয়ার কারণ নয়।
বিজ্ঞানীরা অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো এবং বন্য বিড়ালদের মধ্যেও আকারে আগের তুলনায় বড় হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখতে পেয়েছেন। এসব বিড়াল মাঝে মাঝে মানুষের ফেলা খাবার খেয়ে বাঁচলেও, নিয়মিত খাবার পায় না—তবুও তারা আকারে বড় হয়ে উঠছে।
বড় ও মিশুক বিড়াল
তাহলে ভবিষ্যতের বিড়াল কেমন হবে? একটি সম্ভাবনা হলোভবিষ্যতের বিড়াল আজকের তুলনায় আরও বড় হতে পারে।
এছাড়া মানুষের সঙ্গে বিড়ালের চলমান সম্পর্ক তাদের আরও সামাজিক ও বন্ধুসুলভ করে তুলতে পারে।
প্রকৃতিগতভাবে বিড়াল তুলনামূলকভাবে একাকী থাকতে এবং দূরত্ব বজায় রাখতে পছন্দ করে। অন্যদিকে কুকুর অনেক বেশি দলবদ্ধ প্রাণী।
তবে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে মেলামেশা কিছু বিড়ালকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। বিশেষ করে যারা স্বভাবগতভাবে একটু বেশি বন্ধুসুলভ এইসব বিড়াল তাদের জিন পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়েছে, ফলে সময়ের সঙ্গে সামাজিক স্বভাবের বিড়াল বাড়তে শুরু করেছে।
তাই কালের পরিক্রমায় বিড়ালরা আরও সহজাতভাবে বন্ধুসুলভ পোষা প্রাণীতে রূপ নিতে পারে।
তবে এসব পরিবর্তনের পরও বিড়ালের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য এখনও অটুট। তা হলো এই প্রাণীটি যখন কাউকে আদর করে বা পাশে এসে বসে তখন সেটা তারা সত্যি মন থেকেই করে, বাধ্য করে তাদের থেকে এই ধরনের আচরণ আদায় করা যায় না।
গবেষকরা গৃহপালিত বিড়ালদের সামাজিক আচরণ ও ব্যক্তিত্ব তুলনা করেছেন তাদের বন্য প্রজাতি মেঘলা চিতা, তুষার চিতা, আফ্রিকান সিংহ ও স্কটিশ বন্য বিড়ালের সঙ্গে।
তারা দেখতে পান গৃহপালিত বিড়াল দলবদ্ধভাবে বসবাসের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়। তারা সাধারণত আগ্রাসী বা কর্তৃত্বপরায়ণ, উদ্বিগ্ন বা স্নায়বিক এবং হঠাৎ রেগে যাওয়ার মতো আচরণ করে—যা কি না বন্ধুত্বের জন্য খুব একটা আদর্শ গুণ নয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে গৃহপালিত বিড়ালের ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে বেশি মিলে যায় আফ্রিকান সিংহের সঙ্গে, যারা দলবদ্ধভাবে থাকে। এর মানে, বিড়ালদের মধ্যেও ভবিষ্যতে দলবদ্ধভাবে থাকার ক্ষমতা বা সম্ভাবনা আছে।
যদিও বিড়ালের বিড়ালের কলোনিগুলো সিংহের মতো নয়, তবুও সঠিক পরিস্থিতি থাকলে বিড়ালরাও একসঙ্গে থাকতে পারে।
মানুষ এখন বিড়ালের মনের গঠন ও আচরণ নিয়ে বেশি গবেষণা করছে। মানুষ বিড়ালের মনস্তত্ত্ব ও আচরণ সম্পর্কে জানার পেছনে যত বেশি সময় ব্যয় করবে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে।
বিড়াল কীভাবে চিন্তা করে, কী তাদের পছন্দ-অপছন্দ, কী তাদের আনন্দ দেয় বা কী তারা সহ্য করতে পারে না—এই বিষয়গুলো বোঝার মাধ্যমে আমরা বিড়ালের জীবন আরও সুখকর করে তুলতে পারব এবং মানুষ-বিড়াল সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
