প্রোটিন চাহিদা মেটাতে ল্যাবে তৈরি হলো ‘মিটি রাইস’ বা 'মাংসের তৈরি ভাত'!
'মাংসযুক্ত' ভাত বা মিটি রাইস নামের নতুন এক ধরনের হাইব্রিড খাবার উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ল্যাবে তৈরি করা এ ভাতকে তারা পরিবেশবান্ধব ও প্রোটিনের সাশ্রয়ী উৎস বলে দাবি করছেন।
মূলত গরুর মাংস এবং এর ফ্যাট কোষগুলোর সাথে ধানের শস্য মিশ্রিত করে তৈরি করা হয়েছে এ ভাত ।
এ ভাত তৈরির জন্য প্রথমে চালের ওপর মাছের জেলেটিনের প্রলেপ দেওয়া হয় যাতে সহজে মাংসের কোষগুলো ধানের দানার সাথে লেপ্টে থাকে। তারপর এ দানাকে ১১ দিন ধরে ল্যাবে কালচার ট্রেতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
গবেষকরা বলছেন, এই হাইব্রিড চালকে ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষকালীন ত্রাণ, সামরিক রেশন এবং মহাকাশের খাবারসহ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং এটি বিশ্বব্যাপী খাদ্যঘাটতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বাজারে এলে ভোক্তারা এটিকে গ্রহণ করবে কিনা তা এখন মূল চিন্তার বিষয়।
ম্যাটার জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাইব্রিড চাল সাধারণ চালের চেয়ে কিছুটা শক্ত ও ভঙ্গুর হলেও এতে বেশি প্রোটিন থাকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োনসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের মতে, এতে ৮ শতাংশ বেশি প্রোটিন এবং ৭ শতাংশ বেশি ফ্যাট রয়েছে।
সাধারণ গরুর মাংসের তুলনায় ল্যাবে তৈরি করা এ মাংসযুক্ত ভাতে কার্বন নিঃসরণ কম হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম প্রোটিনের বিপরীতে হাইব্রিড চাল সর্বোচ্চ ৬.২৭ কেজি (১৩.৮ পাউন্ড) কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত করে, আর সমান প্রোটিনের জন্য সাধারণ গরুর মাংস থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দাঁড়ায় আটগুণ বেশি প্রায় ৫০ কেজি।
গবেষক সোহিয়ন পার্ক ব্যাখ্যা করেছেন, 'আমরা সাধারণত আমাদের প্রয়োজনীয় প্রোটিন গবাদি পশু থেকে পাই, তবে এর জন্য খামারে প্রচুর খাবার এবং পানির প্রয়োজন হয় যা গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি করে।
এখন মাংসের সমান প্রোটিন যদি ল্যাবে উৎপাদিত এ হাইব্রিড চাল থেকেই পাওয়া যায় তাহলে কেমন হতো ভাবুন?'
মাংসের কোষগুলোর সঠিক বৃদ্ধির জন্য ভাত একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে এবং এটি মাংসের কোষকে পুষ্টিও দেয়।
পার্ক জানান, ভাতে পুষ্টি আছে, তবে এর সাথে মাংসের পুষ্টি উপাদান যোগ হলে সার্বিক পুষ্টিমান আরও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, 'চালগুলো এত ভালোভাবে তৈরি করা যাবে ভাবিনি। আমি এখন এই শস্য-ভিত্তিক হাইব্রিড খাবারের জন্য বিশ্বে দারুণ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।'
মানুষকে বুঝতে হবে
এর আগে থেকেই অনেক দল গবেষণাগারে মাংসজাত উৎপাদন করার চেষ্টা করছে। ২০১৩ সালে লন্ডনে প্রথম ল্যাবে তৈরি বার্গার উন্মোচনের পর থেকে বিশ্বজুড়ে কয়েক ডজন কোম্পানি সাশ্রয়ী মূল্যে কৃত্রিম মাংস বাজারে আনার প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছে।
সিঙ্গাপুর সম্প্রতি ক্রেতাদের কাছে বিশ্বের প্রথম ল্যাব উৎপাদিত মুরগির পণ্য বিক্রি করা শুরু করেছে।
এদিকে, ইতালি তাদের দেশের খাবারের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ল্যাবে উৎপাদিত সকল ধরনের মাংস নিষিদ্ধ করার একটি বিল পাশ করেছে।
তবে সমালোচকরা জানান যে, ল্যাব-উৎপাদিত মাংসে সিন্থেটিক কিছু নেই বরং এটিকে প্রাকৃতিক কোষের বৃদ্ধি দ্বারা তৈরি করা হয়।
ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি-খাদ্য ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নিল ওয়ার্ড বলেন, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যকর এবং আরও জলবায়ু-বান্ধব খাবার উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এ ধরনের গবেষণা ভূমিকা রাখবে। কিন্তু মানুষকে তা বুঝতে হবে।
তিনি বলেন, 'বাজারের প্রক্রিয়াজাত মাংসকে ধীরে ধীরে ল্যাব-উৎপাদিত মাংস প্রতিস্থাপন করে ফেলবে।'
ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনের ব্রিজেট বেনেলাম বলেন, 'একইসাথে পৃথিবী এবং মানুষ উভয়ের জন্য কল্যাণকর এমন খাবার তৈরি করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই গবেষণাটি একটি নতুন পদ্ধতির প্রদর্শন করে যা সামনে এর সমাধানে অবদান রাখতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'গবেষণার ফলাফল দেখা যায় ভাতে প্রোটিন সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই এটিকে এখনই উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার বলা যাবে না। এই প্রযুক্তিকে প্রচলিত প্রাণিজ পণ্যের বিকল্প প্রোটিন উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে আরও কাজ করতে হবে।'
অনুবাদ: সাকাব নাহিয়ান শ্রাবন
