‘অ্যাসট্রে রানি’ নামে খ্যাত রানি মার্গারেটের রঙিন জীবনের ভেতরের গল্প
প্রত্নতত্ত্ব আর শিল্পকলার প্রতি গভীর আগ্রহ, উজ্জ্বল রঙের রেইনকোট পড়তে আর হটডগ খেতে ভালোবাসা, ৬ ফুট উচ্চতার সুঠাম দেহের, "চেইন স্মোকার' এই নারী ইউরোপের রাজপরিবারগুলোর সদস্যদের মধ্যে অন্যতম সমাদৃত এবং বর্ণাঢ্য এক চরিত্র।
কিন্তু, এবছর শুরুর আগেই (নতুন বছরের আগের দিন) রানি দ্বিতীয় মার্গারেট সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ১৪ই জানুয়ারি রাজ্যাভিষেক হবে তার ছেলে– রাজপুত্র ফ্রেডরিখের। এর মধ্যে দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে রানি মার্গারেটের ৫২ বছরের শাসনামল। তাঁর এই ঘোষণা অবাক করেছে তাঁর দেশবাসীকে, পশ্চিমা অন্যান্য দেশেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অথচ ডেনমার্কের ৮৩ বছরের এই রানি-ই একবার বলেছিলেন, "আমি কখনোই সিংহাসন ছাড়তে পারব না। একমাত্র বাজেভাবে অসুস্থ হলেই– সেটা সম্ভব হতে পারে।" তাঁর এক সময়কার এই বক্তব্যই ৬০ লাখের বেশি ডেনিশ নাগরিকদের রানির পদত্যাগ নিয়ে নানান ধরনের গুঞ্জনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডেনিশ রাজপরিবারের ১,২০০ বছরের ইতিহাসে রানি মার্গারেট সিংহাসনে ছিলেন সবচেয়ে দীর্ঘসময়। তাঁর শাসনামল ছিল অর্ধ শতাব্দীরও বেশি; এত দীর্ঘসময় রানি থাকার দিক থেকেও প্রাচীন এ রাজপরিবারের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
তাঁর পরিবারের হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো ইতিহাস সমৃদ্ধ। ডেন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ভাইকিং রাজা 'গ্রোম দ্য ওল্ড' পর্যন্ত বিস্তৃত সেই ইতিহাস। ২০২২ সালে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর, ইউরোপীয় রাজন্যদের মধ্যে মার্গারেট সবচেয়ে দীর্ঘসময় সিংহাসনে থাকার খেতাব অর্জন করেন।
তবে কেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মতো কর্তব্যে অনড় ডেনমার্কের এই রানির হঠাৎ পদত্যাগ?
এই প্রশ্ন খুবই সঙ্গত। কারণ, ডেনিশ জনগণের মধ্যে রাজপরিবারের গ্রহণযোগ্যতা প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। ২০১১ ওসলো ওয়ার্ল্ড স্কি চ্যাম্পিয়নশিপে দর্শকদের সাথে এক হাতে অ্যাপেল জুসের প্যাকেট ধরে, অন্যহাতে হটডগ খেতে দেখা যায় রানি মার্গারেটকে। সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন, আর তার স্থাপত্য শিল্পের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসাও তাঁর এই জনপ্রিয়তার কারণ।
তবে বয়সের সাথে সাথে কিছু শারীরিক সমস্যাও তাঁর দেখা দেয়। ২০২৩ সালে পিঠে বেশ জটিল এক অস্ত্রোপচার হয় তাঁর। এ কারণেই ২০২৩ সালের শেষদিনে রাজকর্তব্য থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে, তিনি সার্জারির বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, "এই অপারেশনটি আমাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে বাধ্য করেছে- এখনই হয়ত উপযুক্ত সময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়ার।"
'অ্যাস্ট্রে রানি' খেতাব পাওয়া রানি মার্গারেট পছন্দ করেন কড়া, অপরিশুদ্ধ ও খুব সরু ক্যারেলিয়া সিগারেট। ছিলেন 'চেইন স্মোকার'। এই অস্ত্রোপচারের পরে তিনি বাধ্য হন তাঁর এই অভ্যাস ছাড়তে।
তবে অনেকেই ধারণা করছেন, তাঁর পদত্যাগের পেছনে আরো কোনো কারণ থাকতে পারে। হতে পারে তার ছেলে, রাজপুত্র ফ্রেডরিখের বিয়েকে দৃঢ় করতেই– সময়ের আগেই তাঁর কাছে সিংহাসন হস্তান্তর করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন কোম্পানিতে কর্মরত, স্কটিশ একজন শিক্ষাবিদের মেয়ে, ম্যারি ডোনাল্ডসনের সাথে রাজপুত্র ফ্রেডরিখের পরিচয় হয় ২০০০ সালের অলিম্পিক গেমস এর সময় সিডনির একটি পানশালায়। এই প্রেমের পরিণয় হয় ৪ বছর পর তাঁদের বিয়ের মধ্য দিয়ে। ঊনিশ বছরের বিবাহিত জীবনে, রাজকুমারী ম্যারি এবং তাদের ৪ সন্তানকে খুবই সমাদর করে ডেনমার্কের জনগণ। রাজকুমারি ম্যারি খুব দ্রুত ডেনিশ ভাষা রপ্ত করে ফেলেন। তার চমৎকার পোশাক-আশাক সকলের মন জয় করেছে।
কিন্তু কিছুদিন আগে এই রাজদম্পতির বিবাহিত জীবনের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। গত নভেম্বরে রাজপুত্র ফ্রেডরিখকে মাদ্রিদের বিখ্যাত 'কোরাল ডে লা মোরেরিয়া' রেস্তোরাঁ থেকে মেক্সিকান রিয়েলিটি টিভি শো তারকা ও অভিনেত্রী ৪৭ বছর বয়সী জেনোভেভা ক্যাসেনোভার সাথে বের হতে দেখা যায়। এনিয়ে ডেনমার্কের পত্রিকাগুলোতে তাদের মধ্যে প্রেমের গুঞ্জন শোনা যায়। তবে জেনোভেভা এধরনের গুজব অস্বীকার করেছেন।
এদিকে এই গুজবকে মিথ্যা প্রমাণ করতে, এই রাজদম্পতি বড়দিনের আগে গির্জায় হাত ধরে একসাথে প্রবেশ করে গুজবকারীদের তাক লাগিয়ে দেন। এরমধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যকার অটুট সম্পর্কের বিষয়টিও প্রকাশ করেন তাঁরা।
এসব গুজব, এবং রানি মার্গারেটের হঠাৎ সিংহাসন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনা অনেকের মনেই প্রশ্ন তৈরি করে– তবে কি আসলেই চির ধরেছে ডেনিশ এই রাজ দম্পত্তির বিবাহিত জীবনে?
নেপথ্য ঘটনা যাই হোক, এনিয়ে কোন সন্দেহ নেই, এই প্রথম ড্যানিস রানি হচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ায় জন্মগ্রহণ করা ম্যারি।
