বুড়ো হচ্ছে ইউক্রেনের সম্মুখ সমরের সৈন্যরা: ‘শারীরিকভাবে আমি আর পেরে উঠছি না’
ইউক্রেনের আভদিভকা দখলে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাচ্ছে রাশিয়া। রুশ সেনারা দফায় দফায় এ শহর লক্ষ্য করে এগোনোর চেষ্টা করেছে। সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে ব্যাপক গোলাবর্ষণ। আক্রমণের এই তীব্রতার মুখে ক্লান্ত ও হতোদ্যম হয়ে পড়েছে ইউক্রেনের সেনারা। যাদের অনেককেই আবার চাপ দিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছে।
২০১৪ সালে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে অঘোষিত এক যুদ্ধে নামে রাশিয়া। এরপরেই আসে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের চূড়ান্ত আগ্রাসন। এই সুদীর্ঘ সময় যারা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর হয়ে লড়েছেন, যুদ্ধাভিজ্ঞ সেই সেনাদের অনেকেই এখন সেনা প্রশিক্ষক। তাঁরা বলছেন, নতুন ভর্তি করা সেনাদের বেশিরভাগরেই যৌবন পেরিয়েছে বহু আগে। শারীরিকভাবেও তাঁরা ততোটা সমর্থ নন।
আভদিভকায় যুদ্ধরত একজন অভিজ্ঞ পদাতিক সেনা বলেন, "নতুন যারা আসছে তাঁদের মান ভালো নয়। এদের বেশিরভাগই গ্রামের লোকজন, যাদের বয়স ৪৩ থেকে ৫০ এর কোঠায়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁদের নানান শারীরিক সমস্যা আছে।"
লড়াইয়ের ক্ষণিক বিরতির এক অবসরে– এমন একজন বয়স্ক সেনার সাথে কথা বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ৪৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি জানান, সেলুনে চুল কাটতে গিয়েছিলেন একদিন, সেখান থেকেই তাঁকে পাকড়াও করেন নিয়োগকর্তারা। এরপর তাঁকে কোনো প্রতিবাদের সুযোগ না দিয়ে ওঠানো হয় গাড়িতে এবং নিয়োগকেন্দ্রে আনা হয়। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি হওয়ার আগপর্যন্ত টানা দুই দিন তাঁকে একটি অন্ধকার কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তাঁর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়– দুবক। একজন ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় তিনি ফ্রন্টলাইনের পেছনের সারিতে টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নিয়োগকর্তাদের। কিন্তু সে কাজ পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়, দুবক যা দিতে পারেননি। ফলে টানা কয়েক মাস লড়াইয়ে জনবলের ঘাটতি দেখা দেওয়া একটি ইউনিটে দুবককে পাঠানো হয়। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক হচ্ছে এই আভদিভকার ফ্রন্টলাইন। বর্তমানে যেখানে প্রতিনিয়ত জীবনবাজি রেখে লড়তে হচ্ছে দুবক ও তাঁর সঙ্গীদের।
দুবক ৪৭তম মেকানাইজড ব্রিগেডের অধীনে রয়েছেন। এই ব্রিগেডের হাতেই আভদিভকার প্রতিরোধের ভার। কিন্তু একের পর এক রুশ আক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে এ সেনা ইউনিটকে।
দুবক বলেন, 'শারীরিকভাবে আমি আর পারছি না; এখন যে আর ২০ বছরের যুবক নই, তা হারে হারে টের পাচ্ছি– সেজন্য গভীরভাবে হতাশও।'
টানা দুই বছরের যুদ্ধে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী। হারিয়েছে অজস্র সেনা। তাই বাহিনী পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। পদাতিক সেনাদের মধ্যেই আহত-নিহতের সংখ্যা বেশি, দুই বছরের যুদ্ধে অসংখ্য সদস্যকে হারানোয় পদাতিক সেনা সংখ্যায় বিশাল ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে দেশরক্ষার যুদ্ধে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন ইউক্রেনের অনেক মানুষ। কিন্তু, তাঁদের বেশিরভাগই হয় মারা গেছেন নাহলে গুরুতর আহত হয়ে চিরতরে যুদ্ধ-সক্ষমতা হারিয়েছেন, যারা টিকে আছেন তাঁরাও ভীষণ ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। এই অবস্থায় ইউক্রেন ঘাটতি পূরণ করতে সেনাভর্তির ওপর নির্ভর করছে, এবং তারই অংশ হিসেবে অনেক সময় লোকজনকে ধরে নিয়ে এসে নাম লেখাতে বাধ্য করছে।
রাশিয়াও প্রচুর সেনা হারিয়েছে এ যুদ্ধে। তবে ইউক্রেনের চেয়ে তাদের জনসংখ্যা বড়, যেখান থেকে এই শূন্যতা পূরণ করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ।
কিন্তু, দুর্বল ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে সীমিত এই জনসংখ্যা থেকেও কার্যকরীভাবে নতুন সেনা ভর্তি করতে পারছে না ইউক্রেন। যা করা গেলে, ইউক্রেনের সমাজের সকল অংশের ওপর এই চাপ সমানভাবে পড়তো। ফলে সমাজের কোন একটি অংশের জন্য তা বোঝা হয়ে উঠতো না বলে জানান দেশটির অনেক সেনাসহ ও আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।
সেনা ভর্তি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, ব্যতিক্রম ও রাজনৈতিক বিবেনায় ছাড় দেওয়ারও নজির আছে। একারণে ইউক্রেনের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বেশিরভাগই যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে পারছে, অন্যদিকে গ্রাম বা মফস্বল শহরগুলোর সামাজিক চিত্র এর বিপরীত। এখানকার অধিবাসীরা ভর্তি এড়ানোর সুযোগ পাননি, এবং তাঁদেরকে এখন লড়তে হচ্ছে ফ্রন্টলাইনে, প্রচণ্ড শীতের মধ্যে থাকতে হচ্ছে কর্দমাক্ত পরিখায়। ভর্তি প্রক্রিয়ায় সামাজিক এ বৈষম্য নিয়ে চরম ক্ষোভ রয়েছে ইউক্রেনে।
দুবককে যেদিন জোর করে ধরে আনা হয়, সেদিন বাড়িতে তাঁর জন্য স্টবেরি কেক নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর স্ত্রী। এখন তাঁকে আভদিভকার কর্দমাক্ত রণাঙ্গনে দেখতে হচ্ছে নিহত সেনাদের মৃতদেহ কীভাবে ছিড়েখুড়ে খাচ্ছে ইঁদুরের দল। তিনি বলেন, 'আমার জীবনে কোনদিন এত বড় বড় ইঁদুর দেখিনি।'
রাস্তা থেকে লোকজনকে ধরে নিয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার এমন অসংখ্য কাহিনি এখন ইউক্রেনে। এরমধ্যে কিছু ঘটনার ভিডিও ইন্টারনেটে প্রকাশও হয়েছে।
নিপ্রো এলাকার একজন আইনজীবী সেরহি পারোখেঙ্কো বলেন, 'এটি বেআইনি। নিয়োগকর্তারা কেবল ভর্তির নোটিশ ধরিয়ে দিতে পারেন, কাউকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার অধিকার তাঁদের নেই।' পারোখেঙ্কোর অনেক মক্কেল এভাবে জোর করে ভর্তির বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয় কিছু কর্মকর্তা আইন লঙ্ঘন করেছেন বলে স্বীকার করেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। তবে তিনি এটাও দাবি করেন যে, অনেক বেশি সংখ্যক নাগরিক ভর্তির ডাক পেয়ে তা অগ্রাহ্যও করছেন।
ইউক্রেনে চলছে শক্তিক্ষয়ের এক যুদ্ধ, এরমধ্যে পদাতিক সেনাদলে স্বেচ্ছায় যোগদানে ইচ্ছুক লোকজন খুঁজে পাওয়া দিনকে দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা সমর্থন হ্রাসের ঘটনাও দেশবাসীর মনোবলে কালো ছায়া ফেলেছে, এতে সম্মুখভাবে লড়াই চালিয়ে যাওয়া আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক ও আর্থিক সহায়তা আটকে রাখছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যকে বাধাগ্রস্ত করছে হাঙ্গেরি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ওরবান দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এখনও যার রেশ রয়েই গেছে।
এই পরিস্থিতিতে, পশ্চিমা বিশ্বের অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানোর গতি কমে গেছে। ফলে কামানের গোলাবর্ষণের সংখ্যায় আবারো আধিপত্য ফিরে পেয়েছে রাশিয়া। অথচ চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিমা সহায়তার কারণে রাশিয়ার সাথে এদিক থেকে সমতা অর্জন করেছিল ইউক্রেন।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুস্তম উমারভ সম্প্রতি জানান, বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ মানুষ দেশটির সেনাবাহিনিতে যুক্ত রয়েছে। এই দাবির সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা চরম গোপনীয়তার সাথে রক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু, ইউক্রেনের হাসপাতালে আহতদের ভিড় যেভাবে বাড়ছে, যেভাবে ভরে উঠছে একের পর এক গোরস্তান– তাতে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধে দেশটি যে চরম মূল্য দিচ্ছে – সেই চিত্রই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কাগজে-কলমে ইউক্রেনের কাছে এখন যুদ্ধসক্ষম জনসংখ্যার বড় রিজার্ভ আছে। যেমন কয়েক মিলিয়ন যুবক রয়েছে যাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ এর কোঠায়। ইউক্রেনের পার্লামেন্ট সেনাভর্তির বয়সসীমা কমিয়ে ২৫– এ নামালেও সামরিক বাহিনী এখনও ২৭ বছরের কম বয়সী পুরুষদের ভর্তি করছে না। তবে এদের মধ্যে যারা একাধিক সন্তানের পিতা, বা বৃদ্ধ ও অক্ষম আত্মীয়স্বজনের দেখাশোনা করেন অথবা গুরুত্বপূর্ণ খাতে চাকরি করেন– তাঁদের বাদ রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া, সেনাবাহিনিতে ভর্তি হওয়া এড়াতে বিপুল সংখ্যক সক্ষম ইউক্রেনীয় যুবক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যদিও যুদ্ধকালীন আইনের আওতায়, ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী বেশিরভাগ মানুষের ইউক্রেন ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু, তাতেও দেশত্যাগ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
এর সাথে যোগ হয়েছে সেনাভর্তিতে ঘুষ বাণিজ্যের প্রভাব, ফলে যারা ঘুষ দিতে পারেন না এমন অনেক বয়স্ককে এখন ভর্তি করা হচ্ছে।
