বিলুপ্তি বহু দূর: যেসব কারণে এখনো কাগজের এত কদর
প্রায় ৪০০ বছর ধরে বিশ্বের সব সাগর ও উপসাগরের তথ্য সংক্রান্ত কাগুজে চার্ট তৈরি করে আসছেন ব্রিটিশ হাইড্রোগাফাররা। যাদের কাজই পানির গভীরতা, স্রোতের তথ্য সংগ্রহ করা। এছাড়া নৌযান চলাচলে বিপত্তি হতে পারে এমন প্রতিবন্ধকতা খুঁজে বের করা। তারা উপকূল থেকে শুরু করে সমুদ্র, বড় খাল সবকিছুর তথ্যই লিখে রাখে। এসব চার্টে থাকে কোথায় নোঙর ফেলা যাবে না, শিলার অবস্থান কোথায় এবং স্থানভেদে সমুদ্রের গভীরতা কত।
যুক্তরাজ্যের হাইড্রোগ্রাফিক অফিসের (ইউকেএইচও) প্রোডাক্ট ম্যানেজার স্টিভেন ব্যাস্টেবল বলেন, এসব চার্ট নাবিকদের খুঁটিনাটি সব কিছুর তথ্য দেয়। সাগরে তাদের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে।
বর্তমানে প্রায় ৩,৫০০টি চার্ট ইউকেএইচও রক্ষণাবেক্ষণ ও হালনাগাদ করে। প্রতিদিন নতুন কোনো তথ্য থাকলে যোগ করা হয়। সপ্তাহিক বুলেটিনের মাধ্যমে হালনাগাদকৃত তথ্য সাগরে থাকা জাহাজে পাঠানো হয় এং ক্রু মেম্বাররা কলম নিয়ে সেগুলো কাগজে ঠিক করে নেন।
ইউকেএইচও ধীরে ধীরে কাগুজে চার্ট থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। যেটা জাহাজে ইলেকট্রনিক চার্ট ডিসপ্লে সিস্টেমে দেখাবে। ২০১৬ সালে সম্পূর্ণ ডিজিটাল হওয়ার লক্ষ্য নিলেও এখন সে ইচ্ছে থেকে সরে আসা হয়েছে।
বিবিসিকে স্টিভেন ব্যাস্টেবল বলেন, আমরা বুঝতে পেরেছি যে এ ক্ষেত্রে (সম্পূর্ণ ডিজিটালে রূপান্তরে) সমস্যা আছে। এটা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে এবং নাবিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।
একসময় হাতে তৈরি হতো এসব চার্ট। এরপর এলো প্রিন্টিং মেশিন। তারপর কম্পিউটার সফ্টওয়্যার। এখন ইউকেএইচও থেকে কাগুজে চোর্টের মুদ্রন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তারা ডিজিটাল ফাইল সরবরাহ করে আর গ্রাহকরা নিজেরাই সেগুলো প্রিন্ট করে নেন। তবে রয়েল ইয়টিং এসোসিয়েশন ঘোষণা দিয়েছে, তারা এখনো চার্টের ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণ দিয়ে যাবে। অর্থাৎ নৌপথে কাগজের আধিপত্য হয়তো আরো চলমান থাকবে।
শুধু এই খাতেই নয়, ২,০০০ বছর ধরে চলমান ঐতিহ্য কাগজ এখনো বিশ্বের নানা দেশে সরকার পরিচালনা ও অসংখ্য ব্যবসায় অতি গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে কম্পিউটার, স্মার্টফোন হয়তো বিকল্প এনে দিয়েছে তবে মচমচে সাদা কাগজে নিজের পছন্দসই কলমের কালি দিয়ে লেখার আনন্দ হয়তো আর কিছুতেই নেই।
অনেক দেশই পরিবেশগত দিক বিবেচনায় কাগজমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে, তবে কাগজের কার্যকারিতা, এমনকি নিরাপত্তার খাতিরেও আসলে সেই লক্ষ্য অর্জন হয়তো সম্ভব হবে না।
নিজের সপ্তাহিক বা মাসিক পরিকল্পনা অভিনব ডিজাইনে লিখে রাখা হয় বুলেট জার্নালে। নানা ডিজাইনের বুলেট জার্নাল নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও করা ইরিন স্মিথ বলেন, অস্ট্রেলিয়ার অনেক কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে কাগজ, কলম, পেন্সিল ও জলরঙের বুলেট জার্নাল তৈরি করে যাচ্ছে, যাতে মানুষ তাদের অভ্যাস ধরে রাখে।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে লেখার চেয়ে কাগজে নিজের পরিকল্পনা লিখে রাখলে তা বেশি কার্যকর। কাগজে লিখে রাখলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ে।
কোনো স্ক্রিনে প্রদর্শিত তথ্য ও কাগজে মুদ্রিত তথ্যে বিপুল ফারাক আছে বলেও মন্তব্য করেছেন ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির মানব-কম্পিউটার মিথষ্ক্রিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রিচার্ড হারপার। সহ-গবেষক আবিগেইল সেলেনসহ প্রকাশিত তাদের 'মিথ অব দ্য পেপারলেস অফিস' এ রিচার্ড দেখান, কেন অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে এখনো কাগজ গুরুত্বপূর্ণ।
তারা লেখেন, কয়েক পৃষ্টা ধরে চলা অনেক জটিল জিনিসও স্পর্শ করে পড়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ক সেগুলো ভালোভাবে ধরতে পারে।
অনেক প্রতিষ্ঠানে আবার এমন বুদ্ধিভিত্তিক নয়, জরুরি প্রয়োজনেই কাগজের প্রয়োজন হয়। ইউকেএইচও-এর মতো অনেক প্রতিষ্ঠানই কাগজমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন নানা জটিলতায় বারবার শেষ সময় পেছাতে হচ্ছে।
সরকারের গোপন বিষয়েও কাগজ গুরুত্বপূর্ণ। যেমন যুক্তরাজ্যে সরকারের কমিউনিকেশন'স বিভাগের সদর দপ্তরের বেসমেন্টের নিচের ভল্টে হাজার হাজার গোপন নথি রাখা আছে। গোয়েন্দা সংস্থা এম১৫ যেমন তাদের ওয়েবসাইটেই লিখে দিয়েছে 'আমাদের কাছে কাগুজে ফাইল এখনো গুরুত্বপূর্ণ।'
ক্রেমলিনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ফেডারেল গার্ড সার্ভিস কম্পিউটার হ্যাক হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে ২০১৩ সালে আবারো টাইপরাইটারের যুগে ফিরে যায়।
এছাড়া দেশে দেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রেও কাগুজে নথির প্রয়োজন হয়। বিষয়টি এখন কিছুটা পরিবর্তিত হলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাত পুরোপুরি কাগজমুক্ত হতে পারবে না।
স্বাস্থ্য খাতও ব্যাপকভাবে কাগজের উপর নির্ভরশীল। প্রেসকিপশন থেকে হাসপাতালের নথি কিংবা ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট; একবিংশ শতাব্দিতেও এগুলো কাগজে সংরক্ষণ করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব স্কটল্যান্ডে হাসপাতালগুলো ডিজিটাল হলেও সেখানকার কেয়ার হোমগুলো নথি স্টোর করার জটিলতার কারণে এখনো প্রথাগত পদ্ধতিতেই রোগীর তথ্য সংরক্ষণ করে।
ইউরোপের ১১টি দেশে এখনো কাগজেই প্রেসকিপশন দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য খাত ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিলেও এখনো কিছু অংশে কাগজ ব্যবহার হয়।
ইলেকট্রনিক সিস্টেম ব্যর্থ হলেও এখনো কাগজকেই ব্যাকআপ হিসেবে দেখা হয়। ২০১৮ সালে আলাসকান কমিউনিটিতে সাইবার আক্রমণের কারণে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিকল্প হিসেবে কাগজ ও টাইপরাইটারের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যায়।
এমনকি উইকিপিডিয়া 'টার্মিনাল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট পলিসি' নামে জরুরি অবস্থার জন্য একটি পরিকল্পনায় আছে। ডিজিটাল মাধ্যমে ভয়াবহ পর্যায়ের কোনো দুর্যোগ বা অস্তিত্বের হুমকি দেখা দিলে এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে উইকিপিডিয়া এডিটর প্রতি নির্দেশ থাকবে তাদের পেইজের ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধ প্রিন্ট করার। কারণ কাগজই নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়।
যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবহার কমায় কাগজের উৎপাদন কিছুটা কমাতে হয়েছে। তবে এই নেতিবাচক ধারা অবশ্য অতটাও নেতিবাচক নয়। কারণ কাগজের বড় অংশ ব্যবহার হতো সংবাদপত্র মুদ্রনে। অনেক সংবাদপত্র ও সাময়িকী তাদের মুদ্রন বন্ধ করে দেওয়াই ব্যবহার কমার মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়ার্ক ফ্রম হোম বৃদ্ধিও কাগজের ব্যবহার কমাতে অবদান রেখেছে।
তবে ম্যাককেনসির গবেষণায় বলা হচ্ছে, বিশেষ করে প্যাকেজিংয়ে নন-গ্রাফিক কাগজের ব্যবহার বিপুল বেড়েছে। ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ২০ বছরে নন-গ্রাফিক কাগজের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চীন ও ইউরোপে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। করোনাকালে অনলাইন শপিং এখানে একটি বড় কারণ।
ফুড প্যাকজিং, ই-কমার্স পণ্য প্যাকেজিং এবং টিস্যু পেপার; সবকটির চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
ইনভায়রনমেন্টাল পেপার নেটওয়ার্কের ক্যাম্পেইন কো-অরডিনেটর সার্জিও বাফোনি বলেন, নোটবুক বা প্যাকেজিংয়ের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করলে কাগজ এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি জনপ্রিয়। তবে পণ্য বা খাদ্য বহনে পচনশীল মাধ্যম হিসেবে কাগজের উপর অতি নির্ভরশীলতা ক্ষতিকর।
সার্জিও প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিবেদন মতে, প্যাকেজি-এর কাগজ তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি গাছ কাটা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশগত ঝুঁকি সত্ত্বেও নতুন বইয়ের গন্ধ নেওয়ার জন্য; পুরনো বন্ধুর হাতে লেখা চিঠি হিসেবে কিংবা কম্পিউটার ডাটাবেজ নষ্ট হওয়ার ঝুুঁকিতে সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে কাগজ মূল্যবান হয়ে থাকবে।
