ইউক্রেন যুদ্ধের এক ক্রান্তিলগ্ন ঘিরে স্নায়ুচাপ বাড়ছে আমেরিকায়
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো রাজ্যের অ্যাসপেন– পাহাড়ের নেপথ্য দৃশ্যপটে এক সাজানো-গোছানো শহর। লনের ঘাস সুন্দরভাবে ছাঁটা, চারপাশের আর সবকিছুর মতোই পরিপাটি। ইউক্রেনের মাইনফিল্ড ও পরিখা সারির রক্তক্ষয়ী সংঘাত , ধবংসযজ্ঞ থেকে – এ যেন বহুদূরের এক জগৎ। কিন্তু, গত সপ্তাহে দিন কয়েকের জন্য উভয় স্থানের মধ্যে এক যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল। খবর বিবিসির
অ্যাসপেনে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়- 'অ্যাসপেন সিকিউরিটি ফোরাম'; এতে অংশ নেন আমেরিকার প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক, পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা গবেষক, রাজনৈতিকসহ হোমড়াচোমড়া ব্যক্তিত্ব – তারা বাকি বিশ্বের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক বিনির্মাণে ভূমিকা রাখেন।
এবছর ১৮-২১ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় এ ফোরাম। এতে যোগ দিয়ে মার্কিন নীতিনির্ধারক ও থিঙ্ক ট্যাংকদের শীর্ষ ব্যক্তিরা ইউক্রেন যু্দ্ধের অগ্রগতি নিয়ে নানান প্রশ্ন তোলেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কিও ভার্চুয়াল ব্যবস্থায় আলোচনায় যুক্ত হন। অডিটোরিয়ামে বড় পর্দায় জেলেনস্কি মার্কিন নীতিনির্ধারক মহলের কাছে সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে স্বীকার করেন, যুদ্ধের জন্য এটা এক ক্রান্তিলগ্ন – যার ওপরই আগামী দিনে জয়-পরাজয়ের ভারসাম্য নির্ভর করছে।
বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদক গর্ডন কোরেরা এই ফোরাম কাভার করতে অ্যাসপেনে যান। তিনি লিখেছেন, 'তিন সপ্তাহ ইউক্রেনে কাটানোর পর অ্যাসপেনে এসে (নীতিনির্ধারক মহলে) আমি এক ধরনের স্নায়ুচাপ ও অস্থিরতা লক্ষ করেছি। আর সেটা যে খুব চাপা তেমনও নয়। কেবল ইউক্রেনের পাল্টা-আক্রমণ অভিযানের (মন্থর) গতি নিয়েই নয় – যুদ্ধে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ঘিরেও যা বিরাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগের কারণও যথার্থ। বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে সহায়তা দানে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে। দেওয়া হয়েছে বিপুল সমরাস্ত্র, আর্থিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশিক্ষণ। কিন্তু, এক মাস আগে শুরু হলেও – ইউক্রেনের পাল্টা-আক্রমণ অভিযান 'কঠোর সংগ্রামে' রূপ নিয়েছে। প্রত্যাশিত দ্রুত অগ্রগতি দূরস্থান, অভিযান কচ্ছপ গতিতে চলছে বললেই যেন যথার্থ হয়। অধিকাংশক্ষেত্রেই দিনে মাত্র কয়েক মিটার ভূমি দখলমুক্ত করতে পারছে ইউক্রেনীয় বাহিনী।
মার্কিন চিন্তক ও নীতিনির্ধারকদের থেকে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির কাছে প্রথম প্রশ্নই ছিল প্রত্যাশার চেয়ে কেন অভিযানের গতি কম – সে প্রসঙ্গে। জেলেনস্কি সংযমের সাথে উত্তর দেন, অভিযানের জন্য দরকারি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ সহায়তা দিতে পশ্চিমা বিশ্ব দেরি করায় – রাশিয়া প্রতিরোধ ব্যূহ শক্তিশালী করা, আরও মাইন বেছানোর সুযোগ পায়। আর সেজন্যই পদে পদে থমকে যাচ্ছে অভিযানের গতি।
কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগের মহল সম্পর্কে জেলেনস্কি ভালো করেই জানেন। সেই ভার কিছুটা লাঘব করতেই যেন আশ্বাস দেন, শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান 'দ্রুত গতি' লাভ করবে এমন মুহূর্ত ক্রমে এগিয়ে আসছে।
ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। বিভিন্ন সময়ে দেশটিকে বিপুল সহায়তা দেওয়া নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসন্তোষ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সহায়তা প্যাকেজগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও বিভিন্ন সময় উঠেছে প্রশ্ন। তবু অবিচল থেকেছে বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু, রাজনীতির হিসেবনিকেশ এক রুঢ় বাস্তবতাই।
তাই বিভিন্ন সময়েই কোন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে – তা নিয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্বেগও পরিলক্ষিত হয়েছে।
এরমধ্যেই অ্যাসপেনে আরও সহায়তা দানের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন জেলেনস্কি। কিন্তু, তার মাত্র দুই-এক ঘণ্টা পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান বলেন, এফ-১৬ ফাইটার জেট ইউক্রেনকে যদি আগেই দেওয়া হতো – তারপরও চলমান অপারেশনে সেটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারতো না বলেই মনে করেন আমেরিকার সামরিক উপদেষ্টারা।
অস্ত্র সরবরাহের সাথে যুক্ত অন্য আমেরিকানরা ব্যক্তিগতভাবে বিবিসির প্রতিবেদককে জানিয়েছেন যে, কাউন্টার অফেন্সিভের জন্য দরকারি সব যুদ্ধ-সরঞ্জামই রয়েছে ইউক্রেনের। আর ভবিষ্যতে একই মাত্রায় কিয়েভকে অস্ত্র-সজ্জিত করাটা হয়তো সহজ হবে না। আর একারণেই রণাঙ্গনের পরবর্তী পর্যায়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এই পর্যায়ে সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অস্ত্র সাহায্য।
পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, যুদ্ধে অচলাবস্থা বিরাজ করছে, বা কোনো পক্ষই তেমন সুবিধে করতে পারছে না মনে হলেও – এখনও তা সেই পর্যায়ে যায়নি। কারণ, ইউক্রেন এখনও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যুহের দুর্বল স্থান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। একবার সেটা পাওয়া গেলেই রিজার্ভে রাখা সেনা ও সরঞ্জাম দিয়ে সর্বশক্তিতে সেখানে হামলা করা হবে। আর এভাবে প্রতিরক্ষা প্রাচীর ভেদ করে ব্যাপক অগ্রগতির আশা করছে কিয়েভ।
এই কৌশল কাজে দিলে, ইউক্রেনের অবস্থান শক্তিশালী হবে। বাইডেন প্রশাসনের পক্ষেও সহায়তা পাঠানো সহজ হবে। কিন্তু, তারা যদি ব্যর্থ হয় – তাহলেই অচলাবস্থার মন্তব্য সঠিক বলে প্রমাণিত হবে। এনিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-সহ অন্যান্য মিত্র দেশের রাজধানীতে– জটিল রাজনৈতিক সংলাপ ও বিতর্কের ধারাবাহিকতা দেখা দিবে তখন।
তাছাড়া, যুদ্ধ কেবল অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়েই হয় না – একইসঙ্গে তা ইচ্ছেশক্তি ও ক্ষমতায় টিকে থাকারও লড়াই। তাই হয়তো মার্কিন সরকারের ওপর চাপ কমাতে অ্যাসপেনে উপস্থিত কূটনীতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনোযোগ অন্যদিকে আকর্ষণের কৌশলও নেন। তারা বলেন, পশ্চিমা চাপে রাশিয়ার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে এমন লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।
আর সেটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়, এক মাস আগে ওয়াগনারের তৎকালীন প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোঝিনের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। প্রিগোঝিন মস্কোর সামরিক নেতৃত্বের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে করেন এই বিদ্রোহ। রুশ সেনাবাহিনী ও কমান্ডারদের মধ্যে মনোবল চিড় ধরার খবর যখন জানা যাচ্ছে – তারমধ্যেই কতিপয় শীর্ষ জেলারেলকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর এসব দুর্বলতা তুলে ধরার বিষয়েই বেশি আগ্রহী ছিলেন ফোরামে উপস্থিত যুক্তরাস্ত্র ও ইউক্রেন সরকারের কর্মকর্তারা।
ইউক্রেনের ক্ষেত্রে এটা তাদের হৃতভূমি পুনরুদ্ধারের প্রতিজ্ঞাও বটে। দেশটির কোনও কর্মকর্তাই রাশিয়ার সাথে আপোষ বা আলোচনার কথা বলতে মোটেই আগ্রহ দেখাননি। যা ইউক্রেনের জনগণের অটল মনোভাবেরই প্রতিফলন।
তবু এরমধ্যেই পশ্চিমা সমর্থনে চিড় ধরার লক্ষণ কিন্তু দেখা যাচ্ছে।
মার্কিন জনতার অনেকের কাছে ইউক্রেন নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের অতি-আগ্রহ বোধগম্য নয়। অ্যাসপেনে উপস্থিত অনেক কংগ্রেস সদস্য উল্লেখ করেন যে, ইউক্রেনটা মানচিত্রের কোথায় সেটাও তাদের ভোটারদের বেশিরভাগ জানেন না। এই অবস্থায় যে বিপুল আর্থিক অঙ্গীকার যুক্তরাষ্ট্র করেছে – তার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন এই আইনপ্রণেতারা।
ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে সহায়তা পাঠানো বন্ধের এক প্রস্তাবে পক্ষে – অ্যাসপেন সম্মেলনের মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ৭০ জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা কংগ্রেসে ভোট দেন – এতজনের পক্ষে ভোটদান ছিল অপ্রত্যাশিত। এদিকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের রিপাবলিকান দলের প্রাথমিক লড়াই শুরু হয়েছে। যেখানে প্রার্থীরা বলছেন, বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পাঠিতে সস্তা হাততালি কুড়ানোর বদলে তারা এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যয় করতে চান।
ভবিষ্যতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও এক কালো মেঘের মতো উদ্বেগের ছায়া ফেলেছিল অ্যাসপেনে। কারণ, তিনি পুনঃনির্বাচিত হয়ে আসলে কেবল ইউক্রেনই নয় বরং বিশ্বে আমেরিকার অবস্থান এবং সব মিত্রদের সাথে তার সম্পর্কের ধারাবাহিকতা আবারও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্প পুনঃনির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ওয়াকিবহাল – এবং গোপনে উদ্বেগও প্রকাশ করছে তারা। বিশেষত তাদের ধারণা, এতে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন হ্রাস পাবে। বিশেষত যখন আগামী বছরেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন।
এপর্যন্ত পাওয়া সহায়তার জন্য ইউক্রেনের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত এমন মন্তব্য করে কিছুদিন আগে শেষ হওয়া ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে সমালোচিত হন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস।
জেলেনস্কি তার এক টুইট বার্তায় ইউক্রেনের জন্য ন্যাটো সদস্যপদ লাভের সুস্পষ্ট পথ না থাকার বিষয়ে সমালোচনা করেছিলেন। হয়তো তাকে ওয়াশিংটনে চলমান বিতর্কের বিষয়ে সাবধান করতেই একথা বলেন বেন ওয়ালেস।
অ্যাসপেন ফোরামে যোগ দিতে আসেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস ক্লেভারলি। উপস্থিত গণ্যমান্যদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দানকালে তিনি বলেন, "যুদ্ধে অচলাবস্থা চলছে – এ ধরনের রাশিয়ান প্রপাগান্ডা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানো উচিত হবে না।"
ইউক্রেনকে সাহায্য করার ব্যাপারে মার্কিন সরকারের আত্মরক্ষামূলক অবস্থান থেকে সরে আসা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার কথায় ইঙ্গিত মেলে যে, অ্যাসপেনে সমবেত অভিজাত নীতিনির্ধারক ও কিয়েভ প্রশাসন উপলদ্ধি করছে – আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাস হবে যুদ্ধের এক কেন্দ্রীয় মুহূর্ত। এই মুহূর্তে তাই পিছু হটে আসা উচিত হবে না মিত্রদের।
তবে দিনশেষে রণক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাফল্য বা ব্যর্থতা এবং রাশিয়ায় কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার ওপরই নির্ভর করবে পশ্চিমা সহায়তার মাত্রা। বিশেষত আমেরিকান সহায়তার ক্ষেত্রে।
