হাজার হাজার ইউক্রেনীয় সেনা যুদ্ধে নিখোঁজ, অনুসন্ধানে মিলছে না পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা
গত ১৯ এপ্রিল দনেৎস্কের কাছে রাশিয়ান সেনাদের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের পর নিখোঁজ হন ভানিয়া কলোমিয়েতস। যুদ্ধের এক পর্যায়ে তাকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখেন তার ইউনিটের আরেকজন সৈনিক, কিন্তু তিনি নিজেও মারাত্মক আহত হওয়ায় ভানিয়ার কাছে যেতে পারেননি।
ওই এলাকায় কয়েকদিন টানা যুদ্ধ হয়। সেখানে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল রাশিয়া ও ইউক্রেনের সৈন্যদের লাশ। শেষ পর্যন্ত রাশিয়ান সেনারা এলাকাটি দখল করে নেয়। রাশিয়ান জ্যামিংয়ের কারণে ইউক্রেনীয় সেনারা ড্রোন ব্যবহার করে দনেৎস্কের লিম্যানের কাছে ওই যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করতে পারেনি।
ভানিয়া কলোমিয়েতসের বোন তানিয়া কলোমিয়েতস বলেন, 'ও যে ওখানে পড়ে আছে, সে খবরও সঠিক করে কেউ বলতে পারেনি।' হয়তো ভানিয়া এখনো বেঁচে আছেন বলে তার ক্ষীণ আশা।
গত মাসে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ৭,০০০-এর কিছু বেশি যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। নিজেদের প্রিয়জনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা। তাদের এ অনুসন্ধানকে আরও কঠিন করে তুলেছে জটিল আমলাতন্ত্র ও সামরিক বেড়াজাল।
ইউক্রেনের প্যারামিলিটারি কমিটি ফর ভেটেরান'স অ্যাফেয়ার্স-এর সদস্য আনাতোলি অস্টাপেঙ্কো বলেন, 'রাষ্ট্র যদি সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠায়, তাহলে তারা নিখোঁজ হলে তার দেখাশোনার দায়িত্বও এটির নেওয়া উচিত।'
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, দেশটিতে একজন বেসামরিক নাগরিক হারিয়ে গেলে সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সৈন্য নিখোঁজ হলেও একই পদ্ধতি কার্যকর হবে।
ফলে আপনজন কেউ যুদ্ধে নিখোঁজ হলে সে কথা সরকারকে জানানোর পর তদন্তের গতির খোঁজখবর রাখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না পরিবারের সদস্যদের। অস্টাপেঙ্কো মনে করেন এ নিয়ম আরও কয়েক বছর আগেই সংস্কার করা উচিত ছিল।
যুদ্ধের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্থানীয় সামরিক নিবন্ধন দপ্তর থেকে ভানিয়াকে নিখোঁজের তালিকায় যোগ করার কথা জানানো হয় তার পরিবারকে। কিন্তু এরপরে কী হবে, তা বেশ অস্পষ্ট।
'আমরা জানি না কার কাছে যাব, কার দরজায় কড়া নাড়ব,' বলেন তানিয়া। তাত্ত্বিকভাবে দেখতে গেলে, ভানিয়ার পরিবারকে প্রথমে ন্যাশনাল পুলিশের কাছে নিখোঁজের কথা জানাতে হবে।
এরপর পুলিশ কেস ফাইল তৈরি করে হয় অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা অথবা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে অধিকতর তদন্তের জন্য পাঠাবে। এ ছাড়া এ ধরনের তদন্তের জন্য একটি মন্ত্রণালয়ও আছে। তবে বর্তমানে সবগুলো সংস্থার এসব দায়িত্ব, সীমানা, রিসোর্স ও দক্ষতা সব একাকার হয়ে গেছে। তানিয়া বলেন, তিনি আদতেই জানেন না তার ভাইয়ের নিখোঁজের তদন্ত কোন সংস্থার করার কথা।
অন্য ভুক্তভোগীরাও একই আমলাতান্ত্রিক সমস্যায় পড়েছেন। গত বছরের জুন মাসে লুহানস্কের সেভেরোদনেৎস্কের কাছে যুদ্ধে মারা যান গ্যালিনা ভাসিলেভিচের স্বামী। ট্যাংকের গোলার আঘাতে সহযোদ্ধাদের সামনেই তার শরীর উড়ে যায়।
কিন্তু তার মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি, তাকেও নিখোঁজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর তার মৃত্যু নিয়ে একটি সামরিক তদন্ত পরিচালনা করা হয়। পরে ওই কেসটি প্রসিকিউটরের অফিসে পাঠানো হয়।
সেখানে তাকে 'নিখোঁজ' থেকে 'দখলীকৃত অঞ্চলে রাশিয়ান ফেডারেশন দ্বারা খুন' হিসেবে দেখানো হয়। এরপর স্বামীর ডেথ সার্টিফিকেট তুলতে ভাসিলেভিচকে একজন আইনজীবীর সহায়তা নিতে হয়েছিল।
অস্টাপেঙ্কো স্বীকার করেন, 'এ আমলাতন্ত্র জঘন্য।' তিনি জানান, তার কাছে সাহায্য চেয়ে অনেক পরিবারই ফোন করেন। তাদের বেশিরভাগের অভিযোগ যোগাযোগের অভাবের বিষয়ে।
'তারা কোনো কূলকিনারা পান না। তারা থানায় গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে গেলে শুনতে হয়, তিনি এখনো আসেননি, অথবা এই মাত্র বেরিয়ে গেছেন,' বলেন অস্টাপেঙ্কো।
সামরিক কমান্ডার, আর্মির জেনারেল স্টাফ, সশস্ত্র বাহিনীর সিভিল-মিলিটারি রিলেশনস বিভাগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় মর্গ ইত্যাদি সম্ভাব্য সব জায়গায় সাহায্যের আশায় যোগাযোগ করে পরিবারগুলো।
হটলাইনে ফোন করলেও কেউ ধরে না। ফাইলগুলো এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যায়, কোনো সুরাহা হয় না। অস্টাপেঙ্কো এমন একজন মায়ের কথা জানেন, যিনি মারিওপোলে যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়া ছেলেকে নিখোঁজের তালিকায় ওঠাতে নয় মাস অপেক্ষা করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা বাধ্য হয়ে গোয়েন্দাদের কাছে যান, অনলাইনে রাশিয়ান যুদ্ধবন্দিদের বিভিন্ন ভিডিও দেখে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রিয় মানুষটির বিস্তারিত তথ্য লিখেও পোস্ট করেন যদি কেউ কোনো তথ্য দিতে পারে সে আশায়।
এতে আবার ঝুঁকি থাকে। রাশিয়ান স্ক্যামারের অর্থের বিনিময়ে তথ্য দেওয়ার ফাঁদ পাতে। রাশিয়া থেকে আনা মৃতদেহের ছবি দেখেছিলেন গ্যালিনা ভাসিলেভিচ। তিনি জানান, 'মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে গিয়েছিল। আমি ছবি বড় করে সেগুলোর মুখ, দাঁত দেখতাম।'
'এটা মানসিকভাবে খুবই কঠিন,' বলেন অস্টাপেঙ্কো। অনেক সময়ই মৃতদেহ কেবল ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু ইউক্রেনের গবেষণাগারগুলোতেও এখন কাজের চাপ এত বেশি। ফলে অপেক্ষার পালা দিন গড়িয়ে মাসে পড়ছে স্বজনদের।
দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পার্সনস নামক হেগভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক এনজিও এ কাজে ইউক্রেনকে সহায়তা করার প্রস্তাব করলেও দ্য ইকোনমিস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থাটির সঙ্গে কোনো সমঝোতায় স্বাক্ষর করতে ইচ্ছা করে দেরি করছে ইউক্রেন সরকার।
