দক্ষ সেনা ও দরকারি গোলাবারুদের অভাবে ভুগছে ইউক্রেন, বাড়ছে হতাশা
শক্তিশালী প্রতিবেশী রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ লড়তে হচ্ছে ইউক্রেনকে। প্রতিরোধের লড়াইয়ে দেখা যায়, পশ্চিমাদের প্রশিক্ষণ পাওয়া আক্রান্ত দেশের সামরিক বাহিনীর গুণগত মান তাদের রাশিয়ান প্রতিপক্ষের চেয়ে অগ্রসর। তবে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে তাদের। হতাহত হয়ে রণাঙ্গন থেকে বিদায় নিয়েছে ইউক্রেনের অধিকাংশ অভিজ্ঞ সেনা। এমতাবস্থায়, খোদ ইউক্রেনেরই অনেক কর্মকর্তা বহুল প্রত্যাশিত বসন্তকালীন আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। খবর দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির কর্মকর্তারা হতাহতের হিসাব দিয়ে বলেছেন, গত বছরে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা আহত বা নিহত হয়েছে। সে তুলনায়, রাশিয়ান হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। তাতে উচ্ছ্বাসের অবকাশ কিন্তু নেই। রুশ বাহিনী এখনও ইউক্রেনের মাটিতে পরাক্রমে লড়ছে। তাছাড়া, ইউক্রেনের চেয়ে অনেক বড় সেনাবাহিনী আছে রাশিয়ার। আছে প্রায় তিনগুণ বেশি জনসংখ্যা; যেখান থেকে তারা নতুন সেনাভর্তি করতে পারবে। তাই ইউক্রেনও নিজেদের হতাহতের সংখ্যা একেবারেই গোপন রাখে, এমনকী দেশটির কট্টর সমর্থক কিছু ন্যাটো-সদস্য দেশের কাছেও।
পরিসংখ্যানের কথা বাদ দিলেও, সেনাবাহিনীর মান ক্ষয়ের দৃশ্য এখন স্পষ্ট। অভিজ্ঞ সেনাদের জায়গায় সদ্য যোগ দেওয়া সেনাদের আনা হয়েছে ঘাটতি পূরণে। তার সঙ্গে দেখা দিয়েছে, কামান ও মর্টারের গোলার মতোন মৌলিক কিছু গোলাবারুদের ঘাটতি। মার্কিন গণমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে এমনটাই জানান মাঠপর্যায়ের সেনা সদস্য ও কমান্ডাররা।
'কল সাইন' বা পোশাকি ডাকনাম অপারেশনকালীন এক সামরিক চর্চা। ইউক্রেনের ৪৬তম এয়ার অ্যাসল্ট ব্রিগেডের একজন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের কলসাইন কুপল। তিনি এর বেশি পরিচয় না প্রকাশের শর্তে বলেছেন, যুদ্ধে সবচেয়ে মূল্যবান হলো অভিজ্ঞতা। প্রশিক্ষণ শিবির থেকে যে সেনা সরাসরি যুদ্ধে আসছে, তার সাথে রণাঙ্গনে ছয় মাস টিকে থাকা যোদ্ধার রাতদিন পার্থক্য। যদি বলেন আকাশপাতাল ব্যবধান তাহলেই শ্রেয়'।
কুপল বলছেন, 'যুদ্ধাভিজ্ঞতাসম্পন্ন মুষ্টিমেয় কিছু সেনাই এখন অবশিষ্ট আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধে নিহত হয়েছে বা গুরুতর জখম হয়েছে'।
ইউক্রেনীয় ফিল্ড কমান্ডারদের নিজ বাহিনীর সম্পর্কে এতোটা কঠোর বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, পরিস্থিতি আসলেই নাজুক। তবে সবাই তা অকপটে বলেন না। রণাঙ্গনের সম্মুখভাগ থেকে দূরে রাজধানী কিয়েভের ক্ষমতার বলয়েও ছায়া ফেলেছে এই হতাশা। কিন্তু, সেখানে রাখঢাকেরই চেষ্টা বেশি। অবশ্য তাতে লাভ হবে না খুব একটা। শীতকালের শেষ থেকেই আশা করা হচ্ছিল, এই বসন্তে শক্তিশালী পাল্টা-আক্রমণ অভিযানে যাবে ইউক্রেনের সেনারা। কিয়েভ যদি এটা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে দোষ চাপবে পশ্চিমা মিত্রদের ওপর। বলা হবে, পশ্চিমারা লেপার্ড-২ ট্যাংক ও ব্রাডলির মতো সাঁজোয়া যান ও দরকারি প্রশিক্ষণ দিয়েছে অনেক দেরিতে – ইউক্রেনের সেনাশক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় হওয়ার পর।
তবে যুদ্ধাঞ্চলে নাজুক দশা ইউক্রেনের পুরো সামরিক বাহিনীর পূর্ণচিত্র নয়। আসন্ন আক্রমণ অভিযানের জন্য কিছু সেনাদের আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই সেনাদের চলমান লড়াইগুলো থেকে দূরেই রাখছে কিয়েভ। যেমন বাখমুতের যুদ্ধেও তাদের পাঠানো হয়নি। নাম না প্রকাশের শর্তে এমন তথ্যই দেন যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রধান আঁন্দ্রেই ইয়েরমাক আসন্ন পাল্টা-আক্রমণ নিয়ে আশাবাদ ছাড়তে রাজি নন; তিনি বলেছেন, 'আমাদের (আক্রমণ চালানোর) সম্ভাবনা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়েছে বলে মনে করি না। যেকোনো যুদ্ধেই একটা সময় আসে, যখন নতুন সেনাদের প্রস্তত করতে হয়। এখন আমরা সেটাই করছি'।
রুশ সেনাবাহিনীর অবস্থাও ভালো থাকার কথা নয়। গত মাসে ন্যাটোর এক বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেন, রুশ সেনাবাহিনীর ৯৭ শতাংশকে এরমধ্যেই ইউক্রেনে মোতায়েন করা হয়েছে। এই সংঘাতে মস্কো 'প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমহারে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে'।
ইয়ারমাকের মন্তব্য কুপলকে জানানো হলে- তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর জন্য আরো উন্নত মানের প্রশিক্ষণ পাওয়ার আশা করে তিনি আগের কথাগুলো বলেছেন। তিনি আশা করছেন, বর্তমানে তার অধীনে যেসব অনভিজ্ঞ সেনা সম্মুখসারিতে লড়ছে, তার চেয়ে আগামী পাল্টাআক্রমণ অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা সেনারা বেশি সফল হবে।
'যুদ্ধে অলৌকিকের ওপরও ভরসা রাখতে হয়। হয় এটা (ইউক্রেনের জন্য) এক হত্যাযজ্ঞ ও লাশের স্তূপ হবে; নাহলে হবে পেশাদার কাউন্টার-অফেন্সিভ। দুটি ঘটনারই সম্ভাবনা আছে। মোদ্দা কথা, পরিণতি যাই হোক পাল্টা-আক্রমণ অভিযান হবেই'।
বসন্তের আক্রমণ অভিযানে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ শত্রুর তুলনায় ইউক্রেনীয় বাহিনীকে কতোটা এগিয়ে রাখবে, তা এখনও অনিশ্চিত। বিশেষত, যখন বিপুল হতাহতের ঘটনায় ইউক্রেনের শূন্যতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পশ্চিমা সহায়তা নিয়েও হতাশ অনেকে। ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে পশ্চিমাদের প্রতিশ্রুত ট্যাংকের সংখ্যাকে 'প্রতীকী সাহায্য' বলে মন্তব্য করেন। সময়মতো এসব ট্যাংক যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছাবে কিনা তা নিয়েও ব্যক্তিগতভাবে সংশয়ে ভুগছেন তিনি।
তিনি বলেন, 'যথেষ্ট সরঞ্জাম থাকলে, আরো সক্রিয়ভাবে আক্রমণ করা যায়। যদি এসব সম্পদ কম থাকে, তাহলে আপনাকে লড়তে হবে প্রতিরোধের লড়াই। আমরা প্রতিরোধের চেষ্টাই করব। ব্যক্তিগতভাবে এটাই আমার ধারণা। বড় ধরনের কাউন্টার-অফেন্সিভ আমাদের জন্য (কার্যকর হবে) বলে মনে করি না। হয়তো এক সময় আমি এমনটা মনেও করতাম, কিন্তু এখন আমাদের সম্পদ (সেনা ও সরঞ্জাম) এর দিকে তাকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য হচ্ছি– কী দিয়ে পাল্টা-আক্রমণ করব আমরা? খুব বেশি হলে, হয়তো আমরা কিছু অঞ্চলে অগ্রসর হতে পারব'।
সিনিয়র ওই কর্মকর্তার মতে, 'না আমাদের পর্যাপ্ত জনবল, না অস্ত্র আছে। আর আক্রমণের সময় হতাহতও বেশি হয়, এই অনুপাতটা হলো তখন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি সেনা হারাতে হবে। এত বেশি জনবল হারানোর সাধ্য আমাদের নেই'।
ইউক্রেনের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা জনসম্মুখে যেসব আশাবাদী বক্তব্য দেন- তার চেয়ে অনেক বেশি হতাশাপূর্ণ এসব বিশ্লেষণ।
যেমন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি ২০২৩ সালকে 'বিজয়ের বছর' বলে অভিহিত করেছেন। তার সামরিক গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানভ চলতি গ্রীষ্মেই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্রিমিয়া উপদ্বীপ মুক্ত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বুদানভের ভাষ্যমতে, এই গ্রীষ্মের অবকাশটা ইউক্রেনীয়রা ক্রিমিয়ায় কাটাবে। অথচ ৯ বছর ধরে ক্রিমিয়ার দখলে রয়েছে রাশিয়া। এখানে তাদের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়।
তবু উচ্চাশা ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রকাশ্য আলোচনায়। তার সাথে বাস্তবতার যে প্রকট পার্থক্য তার ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয় ইউক্রেনের স্থলবাহিনীর প্রধান কর্নেল জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কির কাছে। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট আমাদের জয়ী হওয়ার প্রেরণা দেন। আসলে আমরা সবাই একইভাবে ভাবছি। আমরা বুঝতে পারছি, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যেভাবেই হোক জিততেই হবে আমাদের। আর এটা খুবই সম্ভব। তবে আমাদের মিত্ররা যদি দরকারি সব ধরনের সহায়তা দেয় তবেই এই সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত হবে'।
কর্মকর্তাদের তুলনায়, যুদ্ধক্ষেত্রে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা অনেক বেশি দুর্ভাবনায় রয়েছেন। চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আনা এক ভবিষ্যৎ যেন তারা দেখছেন।
কুপল ওয়াশিংটন পোস্টকে তার ছবি তোলার অনুমতি দেন। এটা জানার পরও যে এভাবে তার পরিচয় প্রকাশ্যে আসায় এবং খোলামনে রুঢ় বাস্তবতা তুলে ধরায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রোষাণলে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে তার।
যে সেনারা কোনদিন একটি গ্রেনেডও ছোঁড়েনি তাদের নিয়ে যুদ্ধ যাওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, শত্রুর আক্রমণের মুখে তারা পজিশন ছেড়ে পালিয়ে যায়; এমনকী আগ্নেয়াস্ত্র চালনাতেও তাদের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি আছে।
পূর্ব ইউক্রেনের শহর সোলেদারে কুপলের ইউনিটটি লড়েছিল। এই শহরটি এক পর্যায়ে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে রুশ সেনারা। তখন অনভিজ্ঞ সেনাদের নিয়ে কুপলকে পিছু হটতে হয়। পরে সোলেদার দখল করে রুশ বাহিনী।
কুপল জানান, তার ব্যাটালিয়নের সাথে যুদ্ধে অংশ নেওয়া নতুন সেনাদের ইউনিটগুলো প্রবল আক্রমণের মুখে তাদের অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। এই সুযোগে এগিয়ে আসে রাশিয়ার ওয়াগনার মার্সেনারি গ্রুপের যোদ্ধারা। অনভিজ্ঞ সেনারা তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
এক বছর যুদ্ধের পর কুপলের অধীন ব্যাটালিয়নের অবস্থাই বদলে গেছে। এটা যে এক সময়ের নামকরা এক সেনা ইউনিট তাই যেন আর চেনা যায় না। মোট ৫০০ সেনার মধ্যে ১০০ জনই নিহত হয়েছে; আর ৪০০ জন হয়েছে আহত। ফলে সম্পূর্ণ কাঠামোটাই বদলাতে হয়েছে। কুপল জানান, পুরো ব্যাটালিয়নে বর্তমানে তিনিই একমাত্র পেশাদার সামরিক সদস্য। বাকিরা যুদ্ধে অনভিজ্ঞ ও সদ্য প্রশিক্ষত সৈন্য।
'আমি ১০০ নতুন সেনা পেলাম। কিন্তু, তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার কোনো সময় পেলাম না। কর্তারা বলেন, ওদের নিয়ে যুদ্ধে যাও। কিন্তু, তারপর কী হয়, তারা লড়াইয়ে নামলেই সবকিছু ফেলে পালায়। বলতে পারেন, কেন তারা এমন করে? কারণ তারা গুলি চালায় না। আমি একজনকে ডেকে কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে কী বললো জানেন, বললো আমি গোলাগুলির শব্দে প্রচণ্ড ভয় পাই…আর যেকোনো কারণেই হোক ওই ব্যক্তি কখনো গ্রেনেড ছোঁড়েনি। তাই আমাদের সব প্রশিক্ষণ শিবিরে ন্যাটোর প্রশিক্ষকদের দরকার। আর আমাদের প্রশিক্ষকদের পাঠানো দরকার সম্মুখভাগের পরিখায়। কারণ, তারা ঠিকঠাক প্রশিক্ষণদানে ব্যর্থ হচ্ছে'- অকপটে বলছিলেন কুপল।
গোলাবারুদের তীব্র স্বল্পতার কথাও বর্ণনা করেন তিনি। বিশেষ করে, মামুলি মর্টারের গোলা থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমকে-১৯ গ্রেনেডের সংকট রয়েছে বলে জানান।
কামানের গোলার মারাত্মক সংকটে রয়েছে ইউক্রেন; বিষয়টি স্বীকার করে নিয়ে এরমধ্যেই তা সমাধানের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে ওয়াশিংটনসহ পশ্চিমা মিত্ররা। হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দৈনিক বৈঠকে প্রাধান্য পাচ্ছে ইউক্রেনের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদের সরবরাহ নিশ্চিত করার আলোচনা। ওয়াশিংটনের উদ্যমে লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে ইউক্রেন, তবে এখনও তাদের সেনাবাহিনী প্রতিদিন বিপুল হারে গোলা নিক্ষেপ করছে, ফলে স্বল্পতা লেগেই আছে।
সংকটের বর্ণনা দিয়ে কুপল বলেন, 'ধরুন আপনি যুদ্ধের সম্মুখসারিতে, শত্রু আপনার দিকেই এগিয়ে আসছে, কিন্তু তার ওপর আঘাত হানার জন্য গোলাবারুদ নেই'।
তার মতে, কিয়েভের উচিত নতুন সেনাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রশিক্ষিত করা। যদিও তাতে জেলেনস্কি প্রশাসনের ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন কুপল। 'কিয়েভের কর্মকর্তাদের ব্যাপারস্যাপার দেখে মনে হয়, তারা শুধু গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে পারলেই বর্তে যান, সেখানে তারা বলেই খালাস আমরা নাকি এরমধ্যেই জিতে গেছি। আর বেশিদিন মাত্র, হয়তো আর হপ্তাদুয়েক, তারপরই বিজয়মাল্য আমাদেরই হবে' - বলছিলেন তিনি।
দিমিত্র নামের এক ইউক্রেনীয় সেনা ওয়াশিংটন পোস্টকে একই রকম কথা বলেন। তিনি ইউক্রেনের ৩৬তম নৌসেনা ব্রিগেডের সদস্য। তাদের মোতায়েন করা হয়েছে দনেয়স্ক অঞ্চলে। দিমিত্র জানান, তার ব্রিগেডের অধীনে থাকা তুলনামূলক অনভিজ্ঞ সেনারা পরিখা ছেড়ে বাইরে যেতেই ভয় পায়। দনেয়স্কে প্রচণ্ড লড়াই চলছে। 'থেকে থেকে প্রবল গোলাবর্ষণ করছে শত্রুবাহিনী। এই ভয়াবহতায় যেকোনো সেনা প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হতে পারে। আর একবার কেউ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লে, তা অন্যদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমি ওদের দোষ দেই না। তারা আসলেই খুব সংশয়ে দিন কাটাচ্ছে' বলছিলেন তিনি।
যুদ্ধ করতে করতে অভিজ্ঞ সেনাদের ব্যাপক হারে হারানোর ফলেই বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়েছে বলে জানান ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ভ্যালেরি জালুঝনি। জানান, শুধু আগস্টেই প্রায় ৯ হাজার সেনা নিহত হয়েছে। আর ডিসেম্বরে ১৩ হজার সেনা নিহতের কথা জানান জেলেনস্কির একজন উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা অবশ্য প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়েও বেশি বলে হিসাব দিয়েছেন। এর বাইরে যে বিপুল সংখ্যক সেনা গুরুতর জখম হয়ে আর যুদ্ধে অংশ নিতে পারবে না– তাদের সংখ্যা নেই ইউক্রেনের পরিসংখ্যানে।
জার্মান সরকারের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বার্লিনের প্রাক্কলন হলো ইউক্রেনের সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে। তিনি বলেন, 'তারা (জেলেনস্কি প্রশাসন) আমাদের (হতাহতের) সঠিক তথ্য দেয় না, কারণ তারা আসলে আমাদের বিশ্বাস করে না'।
এদিকে জানুয়ারির শুরু থেকেই আক্রমণ অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে রাশিয়া। ধীরে ধীরে তার মাত্রাও বাড়াচ্ছে রাশিয়ানরা। এমনটাই জানান কর্নেল জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কি। ওয়াশিংটন পোস্টকে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান বুদানভ গত মাসে বলেছিলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা রয়েছে। খুব শিগগিরই নতুন করে ভর্তি হওয়া আরো দেড় লাখ সেনা লড়াইয়ে যোগ দেবে। বিপরীতে, জনবলে ঘাটতি ও গোলাবারুদের সংকটের কথাই জানাচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনারা।
