ইউক্রেনের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিচ্ছে রাশিয়া, তাতে আমেরিকা ও পশ্চিমা মিত্রদের ব্যয়ই কেবল বাড়ছে
আধুনিক যুদ্ধ মানেই বিপুল ব্যয়ের বিষয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক সেবাগুলোয় বরাদ্দ ব্যাহত করে যুদ্ধের আয়োজন। যুদ্ধ চালাতে দরকার হয় অতিরিক্ত অর্থ ও সম্পদের; অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ না হলে– যুদ্ধকালে অর্থনীতিও থাকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে। এই চাপটা ইউক্রেনও অনুভব করছে। গত সপ্তাহে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক– ন্যাশনাল ব্যাংক অভ ইউক্রেন কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সদর দপ্তরে এক বৈঠক করে। ওই সভায় উপস্থিত শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, আগামী বছরে দেশটির যুদ্ধ-কবলিত অর্থনীতি আরও পতনের শিকার হবে। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের
গত দুই মাসে ইউক্রেনে মিসাইল হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে রাশিয়া। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে জরুরি অবকাঠামো। ইতঃপূর্বে দেওয়া অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের তার ফলে বাস্তবায়ন হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মস্কোর ব্যাপক মিসাইল হামলার আগে পশ্চিমারা ধারণা করে, সরকার পরিচালনার সাধারণ খরচাপাতি ও পরিষেবা ব্যয় নির্বাহে আগামী বছরে কিয়েভের অন্তত ৫৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। যদিও এটা দেশটির যুদ্ধপূর্ব বার্ষিক ব্যয়ের চেয়েও বেশি। তবে অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির ফলে সহায়তার চাহিদা আরও বাড়বে বৈ কমবে না।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের অবকাঠামো মারাত্মক ক্ষতির শিকার হওয়ায়, এবং রাশিয়া সেগুলোর ওপর আরও হামলা চালাবে এমন নিশ্চিত আশঙ্কা থাকায়; কিছু ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা মনে করেন, প্রতি মাসে ইউক্রেনের আরও ২ বিলিয়ন ডলার করে বৈদেশিক সহায়তা লাগবে। অর্থনীতির সর্বোচ্চ শোচনীয় পরিস্থিতি দেখা দিলে যেন সমর্থন মেলে–এরমধ্যেই সেবিষয়ে পশ্চিমা মিত্রদের প্রস্তুত থাকার তাগিদ দিচ্ছেন ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ওলেগ উসতেঙ্কো বলেছেন, "আপনি যদি ঘর উষ্ণ রাখতে না পারেন–তাহলে কী করবেন? কী করবেন যদি চালাতে না পারেন– দোকান, কারখানা বা অন্য স্থাপনা? আর অর্থনীতিও যদি হয় অচল? তাই আমাদের আরও আর্থিক সহায়তা দরকার। মিত্রদের মধ্যেকার ঐক্য ধবংস করতেই পুতিন একাজ করছেন।"
রাশিয়ার আক্রমণ আরও প্রচণ্ডতর হলে কী হবে- গত সপ্তাহের সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা তা নিয়েও কিছু অনুমান জানিয়েছেন। যেমন তারা বলেছেন, এতে আরও বেশি মানুষ দলে দলে ইউক্রেন ছেড়ে পালাবে, সাথে নিয়ে যাবে যতোটা সম্ভব অর্থকড়ি। ইউক্রেনীয় রিভিনা দিয়ে ইউরো বা ডলার কেনার হিড়িক পরে যাবে, এতে নজিরবিহীন ধস নামবে জাতীয় মুদ্রার মানে।
একারণে আন্তর্জাতিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্যতায় পড়বে ইউক্রেনীয় সরকার। ফলে অতি-দরকারি আমদানি কার্যক্রম এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ/ আসল পরিশোধের প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারবে না। চরমতম এই আর্থিক সংকটকেই বলা হয় 'ব্যালেন্স অভ পেমেন্ট'- এর সংকট।
চলতি বছর ৩৩ শতাংশ কমেছে ইউক্রেনীয় অর্থনীতির পরিসর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমিত আরেকটি মন্দ পরিস্থিতির বিষয়ে বলা হয়েছে, এটি ঘটলে আগামী বছর অর্থনীতি আরও ৫ শতাংশ সংকুচিত হবে। এসব আভাস সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকারদের বৈঠকে। সেটি দেখেছেন এমন একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে এসব কথা জানান ওয়াশিংটন পোস্টকে।
এসব শঙ্কা থেকেই ইউক্রেনীয় নেতারা সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধির জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। মঙ্গলবার প্যারিসে বৈশ্বিক দাতাসংস্থাগুলোর এক বৈঠকে ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ডেনিশ শমিহাল বলেছেন, রাশিয়ার আক্রমণের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সংকোচনের মাত্রা আগামী বছর সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ হতে পারে।
প্রসঙ্গত, অর্থনীতি যখন বিকাশ বা প্রবৃদ্ধির উল্টোপথে বা পতনের দিকে যায়– তখনই তাকে সংকোচন বলা হয়। ১০ মাস ব্যাপী ইউক্রেনের ওপর যুদ্ধভার চাপিয়ে রেখেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফলে টিকে থাকার জন্য বৈদেশিক ত্রাণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কিয়েভকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আর্থিক সহায়তার চাহিদাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছেন পুতিন, যাতে দেশটির পশ্চিমা মিত্ররা হাল ছাড়তে বাধ্য হয়।
গত ১০ অক্টোবর থেকে ইউক্রেনের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে রাশিয়া। ওই সময় ইউক্রেনের কর্মকর্তারা আশাবাদী ছিলেন যে, পশ্চিমা সহায়তার সুবাদে তারা ২০২৩ সালের জাতীয় বাজেটের অধিকাংশ ঘাটতি মেটাতে পারবেন। সেই আশা এখন কেউই করছেন না।
আগামী বছর ইউক্রেনকে ৩০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে এই বরাদ্দের অনুমোদন এখনও পাস হয়নি ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসে।
এ বছর যেসব ঋণ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে– সেগুলো ছাড় হতেও অনেক সময় লাগছে। ফলে অর্থনীতিকে প্রতিযোগী রাখতে বেশি বেশি মুদ্রা ছাপাতে এবং মুদ্রার মান অবমুল্যায়নে বাধ্য হয় কিয়েভ। এতে ২০ শতাংশ উল্লম্ফন ঘটেছে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে।
তবে এসব সহায়তা ছাড় হলেও, তার লক্ষ্য শুধু দেশটি যেন দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে পারে তা নিশ্চিত করা। যুদ্ধের কারণে যে হাজার হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, তার সামান্যতম অংশও এটা দিয়ে পূরণ করা যাচ্ছে না।
রাশিয়ার আগ্রাসনে ধ্বংস হয়েছে ইউক্রেনের অজস্র হাসপাতাল, বন্দর অবকাঠামো, শস্যক্ষেত, সেতু ও দেশটির জরুরি অবকাঠামোর অন্যান্য অঙ্গ। ধস নেমেছে কৃষি খাতের রপ্তানিতে। শস্য রপ্তানির একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিও যে পরিস্থিতির উন্নতি আনতে পারেনি তেমন করে। আবার ইউক্রেনের শিল্পাঞ্চল সমৃদ্ধ বিশাল এলাকা এখন রাশিয়ার দখলে। লড়াইয়ে ধ্বংস হয়েছে দেশটির বনাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ।
জরুরি মানবিক সহায়তার চাহিদাও বহুগুণে বাড়িয়েছে এই যুদ্ধ। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ইউক্রেনীয়র মানবিক সহায়তা দরকার। দেশ অর্থনৈতিক পতনের খাদের কিনারে চলে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির কিছু উপদেষ্টা গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইউক্রেনীয়দের নগদ সহায়তা দিতে পশ্চিমা সরকারগুলোর কাছে হাত পাতার বিষয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। অভ্যন্তরীণ এই আলোচনার সাথে জড়িত দুটি সূত্র বিষয়টি ওয়াশিংটন পোস্টকে জানিয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত বিপর্যস্ত হওয়ায়– সাংঘাতিক এক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে কিয়েভ ও তার মিত্রদের সামনে। ইউক্রেনীয় অর্থনীতির মূল স্তম্ভ– কয়লা খনি, শিল্পোৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি– কোনোটাই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পরিষেবা ছাড়া সচল থাকতে পারছে না। বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশটিতে দারিদ্র্য বাড়তে পারে দশগুণ। আর ইতোমধ্যেই ৩০ শতাংশের কাছাকাছি থাকা বেকারত্ব হার আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে তার সাথে সাথে।
গত সপ্তাহের বৈঠকে অংশ নেওয়া ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সের্গেই নিকোলায়চুক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন পরিস্থিতি থাকলে, মানবিক বিপর্যয় এড়াতে আমাদের আরও বেশি সম্পদের প্রয়োজন হবে।"
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব পর্যালোচনা ও আভাস নিয়ে প্রকাশ্যে সচরাচর বলতে চান না ইউক্রেন বা পশ্চিমা দেশগুলোর কর্মকর্তারা। তারা আসলে বলতে চান না: ইউক্রেনের অর্থনীতিকে যুদ্ধের মূল মঞ্চ বানিয়েছে ক্রেমলিন। আর একাজে রণাঙ্গনের চেয়ে অনেক বেশি সাফল্যও পাচ্ছে মস্কো।
বিদ্যুৎহীন দৈনন্দিন জীবন
কর্মদিবসের অর্ধেক সময়টাই দেখা মেলে না বিদ্যুতের। কিয়েভের একজন ব্যবসায়ী আন্দ্রে বোয়রাস্কি জানান, এখন বিকেল ৪টা নাগাদ শুরু হয় ব্ল্যাকআউট। ফলে তার কর্মীরা ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে কাজ করেন।
রাশিয়ার আক্রমণের কাছে মাথানত করবে না এবিষয়ে দৃঢ়সংকল্প ইউক্রেনীয়রা; কিন্তু, ব্যবসাবাণিজ্য ও কর্মীরা দিন দিন শোচনীয় হয়ে ওঠা পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেক ব্যবসাই বিদ্যুৎহীনতায় বন্ধ হওয়ার পথে।
খনি ও প্রস্তুতকারক শিল্প– ইউক্রেনের মোট অর্থনীতিতে এক-পঞ্চমাংশ অবদান রাখে। এ দুটি খাত বিদ্যুতের অভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশটির সবচেয়ে বড় দুটি ইস্পাত কারখানা দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত, কিন্তু গত মাসে বিদ্যুৎহীনতার কারণে বন্ধ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েক ডজন খনি কর্মী ভূগর্ভে আটকা পড়েন, পরে তাদেরকে উদ্ধার করতে হয়েছে।
ইউক্রেন ভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্থা– ড্রাগন ক্যাপিটালের বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষক ডেনিস সাভকা বলেন, "বড় শিল্প ও ধাতু কারখানাগুলোর জন্য হঠাৎ করে বিদ্যুৎহীনতা খুবই বিপজ্জনক। উচ্চ তাপে কোনো কারগরি প্রক্রিয়া চলার সময় যদি বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে যেকোনো ধরনের বড় বিপদ ঘটতে পারে।"
ড্রাগন ক্যাপিটাল সম্প্রতি তাদের নিজস্ব পূর্বাভাসে দেশটির অর্থনৈতিক সংকোচন ৬ শতাংশ হওয়ার প্রক্ষেপণ করেছে। আগের পূর্বাভাসে তারা ৫ শতাংশের অনুমান করেছিল।
চাপে কিয়েভ ও তার সমর্থকরা
মার্কিন অর্থমন্ত্রী জেনেট এল. ইয়েলেনের কাছে শত শত কোটি ডলার সহায়তার অনুরোধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী সের্গেই মারচেঙ্কো। রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধবংসের ছক কষছে– একথা ইয়েলেনকে জানানোর পর পরই সহায়তা বৃদ্ধির কথা বলতে চেয়েছিলেন তিনি।
গত ১৬ অক্টোবরের ওই সময়ে ধারণা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সহায়তায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে পারবে ইউক্রেন। কারণ, কিয়েভের বাজেট ঘাটতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণের আশ্বাস দিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন। অন্যদিকে, বড় অঙ্গীকারে পিছিয়ে থাকলেও, সহায়তা অব্যাহত রেখেছিল ইইউ।
শক্তিশালী অর্থনীতি না থাকাটাও ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন বিপর্যয়ের আরেক কারণ। অপরিমিত সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকার পরও, যুদ্ধের আগে থেকেই ধনী ব্যবসায়ী ও অভিজাত রাজনৈতিকদের দুর্নীতির শিকার ছিল দেশটি। আর পূর্ণদ্যমে যুদ্ধ শুরুর পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে অর্থনীতি।
