শহরের ভাগাড় বানাতে বলি দেওয়া হচ্ছে বন: ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান অবস্থিত। এটি একটি সংরক্ষিত বন যা ঢাকার 'ফুসফুস' হিসেবে কাজ করার কথা—দেশের হাতেগোনা কয়েকটি শালবনের মধ্যে এটি অন্যতম।
মহাসড়কজুড়ে বনের সীমানা ঘেঁষে বছরের পর বছর ধরে জমে আছে গৃহস্থালি বর্জ্য। রাস্তার ধারের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড় এবং ভাওয়ালের বন এখন পাশাপাশি অবস্থান করছে। কিন্তু ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সীমানার ঠিক মাঝখানে তাকালে আরও ভয়াবহ এক দৃশ্য চোখে পড়ে।
সেখানে সীমানাপ্রাচীরের একটি অংশ ভাঙা। সেখান থেকে বনের ভেতরে একটি রাস্তা চলে গেছে একটি আধা-নির্মিত অবকাঠামোর দিকে—একটি বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, যা সংরক্ষিত বনের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এর পাশেই এখনো ঝুলছে সরকারের '২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি'র একটি প্রচারণামূলক সাইনবোর্ড।
স্টেশনটি নির্মাণ করছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন। তারা একে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরের প্রায় ৫,০২২ হেক্টর শালবনজুড়ে বিস্তৃত। হরিণ, বুনো শূকর, বেজি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের আবাস এই বন।
এদের মধ্যে অনেক প্রাণীরই বনের বাইরে যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই। দ্রুত নগরায়িত হতে থাকা গাজীপুর-ঢাকা করিডোরের জন্য এই বন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখা এবং কার্বন শোষণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বন বিভাগের নথিপত্র
এই প্রতিবেদনের জন্য ভাওয়ালের বন কর্মকর্তা এবং নগর প্রশাসনের মধ্যে বিনিময় হওয়া চিঠিপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে। গত বছরের মার্চে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের একটি ডাম্প ট্রাককে বনের ভেতরে বর্জ্য ফেলার সময় হাতেনাতে ধরা হয়। তখন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা লিখিত অঙ্গীকার করেছিলেন যে এমনটি আর ঘটবে না। তবে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
এ বছরের ১১ এপ্রিল বিকেলে বিশ্বজিৎ এন্টারপ্রাইজ নামের এক ঠিকাদারের অধীনে একদল শ্রমিক উদ্যানের সীমানাপ্রাচীরের কাছে হাজির হয়। চিঠিপত্র অনুযায়ী, তাদের গাজীপুর সিটি করপোরেশন নিয়োগ দিয়েছিল। রেঞ্জ অফিসার তাদের কাছে অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। তা সত্ত্বেও তারা কাজ চালিয়ে যান।
নথিপত্র অনুযায়ী, পরের দিন রাতে শ্রমিকরা এক্সকাভেটর দিয়ে পার্কের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলে এবং সেই গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করে। পরের দিন বন কর্মকর্তারা কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলে ঘটনাস্থলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ শ্রমিক এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়ো হন। সেই ভিড়ের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধের যেকোনো চেষ্টা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক দিন পর একটি যৌথ পরিদর্শনে দেখা যায়, সংরক্ষিত বনের একটি অংশে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিপত্রগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর বা বন বিভাগ—কারো কাছ থেকেই কোনো অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র চাওয়া হয়নি।
১৬ এপ্রিল এবং পুনরায় ২০ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বিষয়টি লিখিতভাবে জানান—প্রথমে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এবং পরবর্তীতে প্রধান বন সংরক্ষক ও পুলিশসহ অন্যদের। চিঠিতে ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ভাওয়ালের ভেতরে যা ঘটছে তা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
কিন্তু কাজ থামেনি। আজ অবকাঠামোটি প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পথে—ঘটনাস্থলের একজন শ্রমিক এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন যে এক সপ্তাহের মধ্যে এটি শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রায় ৭,০০০ বর্গফুট এলাকা জুড়ে এবং ২৫ ফুট উচ্চতার এই স্টেশনে পূর্ণ ক্ষমতায় প্রায় ২,০০০ টন বর্জ্য রাখা সম্ভব।
আইনি বিতর্ক
উদ্যানের সীমানার ভেতরে কিছু ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি (জোত) রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদ বা অন্য কাজে ব্যবহার করেন মালিকরা, যা বনের কোনো ক্ষতি করে না।
এই জমিগুলো বনের সীমানার ভেতরে হওয়ায় আইনত সেখানে মালিকদের করার মতো কিছু নেই—সরকারি নীতি অনুযায়ী বছরের পর বছর ধরে এসব জমি কেবল কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন শেষ পর্যন্ত এমনই একটি জায়গার ওপর তাদের বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনটি নির্মাণ করেছে।
মে মাসের শুরুর দিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। তাদের রিট পিটিশনে সরকার, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বন বিভাগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে রেসপনডেন্ট রাখা হয়। আবেদনে যুক্তি দেওয়া হয় যে ভাওয়ালের ভেতরে নির্মাণকাজ এবং বারবার বর্জ্য ফেলা ১৯২৭ সালের বন আইন এবং ২০২৬ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের লঙ্ঘন।
৪ মে হাইকোর্ট বিষয়টিকে আমলে নেন। আদালত উদ্যানের অভ্যন্তরে তিনটি নির্দিষ্ট প্লটে শেড, রাস্তা বা গভীর নলকূপসহ সব ধরণের নির্মাণকাজ থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এবং তাদের ঠিকাদারকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন। সেই সাথে আগামী ছয় মাসের জন্য ভাওয়ালের আশেপাশে বর্জ্য ফেলা নিষিদ্ধ করা হয়। সংশ্লিষ্ট তিনটি প্লটের মধ্যে দুটি সংরক্ষিত বনের অংশ এবং তৃতীয়টি ছিল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জোত।
বেলার প্রধান নির্বাহী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হওয়াতে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করা রিজওয়ানা হাসান বলেন, 'বর্তমান আইনি কাঠামো, এমনকি সম্প্রতি প্রণীত আইনগুলোও এই ধরণের ঘটনা রোধ করার জন্য যথেষ্ট।'
তিনি বলেন, 'জমিটি ব্যক্তিগত দাবি করা হলেও এর ব্যবহারের ওপর আইনি বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল—তাই এখানে আইনি কোনো ফাঁকফোকর নেই। আইন একটি হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি জমিটি যদি বনভূমি হিসেবে বিজ্ঞপ্তিভুক্ত নাও হয়, তবুও আপনি কি একটি জাতীয় উদ্যানের সীমানার ভেতরে বর্জ্য স্টেশন নির্মাণ করতে পারেন?'
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। করপোরেশন বছরের পর বছর ধরে রাস্তার ধারে ফেলা বর্জ্য সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজিলা খানম বলেন, 'আমরা ময়লা কোথায় নেব? রাস্তায় ময়লা পড়ে থাকাও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।'
সংরক্ষিত বন ও উদ্যান থেকে দূরে কেন এই স্টেশন তৈরি করা হলো না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমরা জমি পাচ্ছি না। আমরা বেশ কয়েকটি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণ করতে চাই, কিন্তু জমি পাচ্ছি না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের বহু জমি প্রয়োজন, কিন্তু আমরা তা পাচ্ছি না। কেউ আমাদের জমি দিতে চায় না।'
পরিবেশগত মূল্য
স্টেশনটি চালু হলে ঠিক কী ঘটবে, তা নিয়ে এখন কেবল ধারণা করা সম্ভব। তবে ভাওয়ালের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম কে এম ইকবাল হোসেন চৌধুরী তার আশঙ্কার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'যদি ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য, প্যাথলজিক্যাল ও হাসপাতালের বর্জ্য, গৃহস্থালি ময়লা, পচা ডিম, পোল্ট্রি ফার্মের বর্জ্য, সিরিঞ্জ, কাচের টুকরো এবং পলিথিন ক্রমাগত ফেলা হতে থাকে, তবে এটি পরিবেশ ও বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করবে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'বনের বন্যপ্রাণীরা এসব বর্জ্য ও ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে এবং মারা যাবে। এটি উদ্যানের বন্যপ্রাণীদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের একটি সতর্কবার্তা।'
তিনি আরও জানান যে গভীর নলকূপ স্থাপনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে, যা নিকটস্থ শালগাছগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বনের ভেতরে নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে ভাওয়ালের বাস্তুসংস্থান স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।
আগামী এক বা দুই মাসের মধ্যে বর্জ্য স্টেশনটি চালু হলে তার এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলো হয়তো বাস্তব রূপ নেবে।
