অস্কার-মনোনীত ছবির অভিনেতা, জিতেছেন ভারতের জাতীয় পুরস্কার, এখন সংসার চালান অটো চালিয়ে
অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার বা অস্কার-মনোনীত ছবিতে অভিনয় করলে যেকোনো শিল্পীর সামনেই নতুন দরজা খুলে যেতে পারে বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতীয় অভিনেতা শফিক সৈয়দের বেলায় তেমনটা হয়নি।
নিউইয়র্কের বর্তমান মেয়র জোহরান মামদানির মা, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ারের 'সালাম বম্বে!' ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু চলচ্চিত্র জগতে তার যাত্রা থেমে গেছে অকালে।
মুম্বাইয়ের রাস্তায় এক কাস্টিং এজেন্টের চোখে পড়েছিলেন শফিক। কিন্তু পরে অভিনয়ের সুযোগ না মেলায় তাকে শেষপর্যন্ত অটোচালক হিসেবেই কাজ শুরু করতে হয়।
প্রথম জীবন
১৯৮০-র দশকে বেঙ্গালুরুর বাড়ি থেকে পালিয়ে বিনা টিকিটে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন শফিক। বলিউডের ছবিতে শহরটাকে যেমন দেখায়, বাস্তব চিত্রটাও তেমন কি না, তা নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন।
মুম্বাইয়ে এসে চার্চগেট স্টেশনের কাছে ফুটপাতে থাকতেন শফিক। একদিন এক মহিলা তার কাছে আসেন। তিনি শফিক ও পথের অন্যান্য শিশুদের একটি অভিনয়ের কর্মশালায় যোগ দেওয়ার জন্য ২০ রুপি দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
প্রতারণা চক্র ভেবে বাকিরা পালিয়ে গেলেও শফিক রাজি হয়েছিলেন। কারণ তখন তিনি অসম্ভব ক্ষুধার্ত ছিলেন। বহু শিশুর মধ্যে থেকে মীরা নায়ারের 'সালাম বম্বে!' ছবির প্রধান চরিত্রের জন্য তাকে বেছে নেওয়া হয়।
ছবিটি ব্যাপক সাফল্য পায়। সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পাওয়া ভারতের মাত্র তিনটি ছবির মধ্যে এটি অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয় আজও।
'সালাম বম্বে!'-র পর
ছবিটির অভাবনীয় সাফল্যের পর শফিক ভেবেছিলেন, অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেবেন। দেশের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সম্মাননা গ্রহণ এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় ছিল তার জীবনের অন্যতম মূল্যবান ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত।
কিন্তু কদিন পরই তার কাছে অভিনয়ের প্রস্তাব আসা বন্ধ হয়ে যায়। নিজেকে ব্রাত্য মনে হতে শুরু করে। এরপর তিনি মুম্বাই ছেড়ে নিজের শহর বেঙ্গালুরুতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বাড়ি ফিরে অভিনয়ের জগৎ পুরোপুরি ভুলে যান শফিক। পেশা হিসেবে বেছে নেন অটোরিকশা চালানোকে। তার দৈনিক ১৫০ রুপি আয়ে চলত পাঁচ সদস্যের সংসার।
'সালাম বম্বে যেন আমারই জীবনের গল্প'
২০১০ সালে ওপেন ম্যাগাজিন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিক বলেছিলেন, 'শুটিংয়ের সময় আমার মনে হয়েছিল, আমার তো অভিনয় করারই প্রয়োজনই নেই। যে ভাষা, গল্প বা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চরিত্রটি যাচ্ছিল, আমি আগে থেকেই সেই জীবনটা পার করে এসেছি। মানুষ "সালাম বম্বে!"-কে "আর্ট ফিল্ম" বলে। কিন্তু সত্যিটা হলো, ওটা তা ছিল না। এটা ছিল একেবারে আমার নিজের গল্প। ভারতের রাস্তায় রাস্তায় যে জীবন, সেটাই ফুটে উঠেছিল এতে। এই জীবন মৃত্যুর থেকে খুব একটা আলাদা নয়। আর আমি সেই জীবনটাই কাটিয়েছি।
'সহ-অভিনেতা রঘুবীর যাদব, নানা পাটেকার, অনিতা কানওয়ার আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন। আমি শিখেছিলাম, অভিনয় মানে হলো কোনো একটা পরিস্থিতিতে একটি চরিত্রের সৎ প্রতিক্রিয়া। সামনের মানুষটার চালচলন দেখেই বুঝতে হতো আমাকে কী করতে হবে। এসব ছোটখাটো বিষয় শিখতে হয়েছিল আমাকে। এমনকি ক্যামেরার সামনে স্বাভাবিক ভাবেনিজেকে তুলে ধরাটাও ছিল সেটে আমার জন্য একটা বড় শিক্ষা।'
শফিক জানান, তিনি বম্বে ফিরে আসার পর বেশ কয়েকটি পত্রিকায় 'সালাম বম্বে!'-র খবর বেরিয়েছিল। বিভিন্ন পুরস্কারের জন্য ছবিটি মনোনীত হতে থাকে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পায়। কিন্তু সেসব পুরস্কারের মঞ্চে কেউ তাকে ডাকেনি। শুধু দিল্লিতে যখন জাতীয় পুরস্কারের জন্য ডাক এল, তখন তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
কাজ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে এই অভিনেতা বলেন, 'বম্বের অসংখ্য ফিল্ম স্টুডিওতে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ পাইনি। কাগজে আমার নাম বেরোনো কাটিংগুলো সঙ্গে নিয়ে ঘুরতাম। অনেকবার এমন হয়েছে যে, একজন জুনিয়র সহকারী পরিচালক কাগজের কাটিং দেখেছেন, আমার ছবি দেখেছেন, আর জিজ্ঞেস করেছেন, "আজ খানা খায়া ক্যা?" (আজ খাবার খেয়েছ?)'
এর আগে দ্য টাইমস অভ ইন্ডিয়া-র সঙ্গে আলাপকালে শফিক বলেছিলেন, 'আমরা ৫২ দিন শুটিং করেছিলাম। তারা আমাকে ১৫ হাজার রুপি দিতে রাজি হয়েছিলেন। আমি ভীষণ রোমাঞ্চিত ছিলাম। শুটিংয়ের পর আমি সিনেমা দেখতে যেতাম আর মুম্বইয়ের রাস্তার খাবার চেখে দেখতাম। ছবিটি সুপারহিট হয়। রাষ্ট্রপতি যখন আমার সঙ্গে ছবি তোলেন, তখন সব কিছুই স্বপ্নের মতো লাগছিল।
'কিন্তু হঠাৎ করেই সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। ছবির কলাকুশলীরা কাজ গুটিয়ে যে যার পথে চলে যান। আমি মুম্বইয়ের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। প্রায় আট মাস ধরে প্রযোজকদের দরজায় কড়া নেড়েছি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি।'
'সালাম বম্বে!'-র পর শফিক সৈয়দ গৌতম ঘোষ পরিচালিত 'পাতাং' ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু এরপর তাকে আর কোনো কাজ করতে দেখা যায়নি।
