শাহরুখের প্রথম ছবি ছেড়েছিলেন বিজয়ের বাবা, মাঝপথে চলে যান নায়ক: যেভাবে ‘দিওয়ানা’ পেয়েছিলেন এসআরকে
১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া 'দিওয়ানা'র হাত ধরেই হিন্দি চলচ্চিত্র পায় তরুণ শাহরুখ খানকে, যা বদলে দিয়েছিল বলিউডের ইতিহাস। সেই বছর বক্স অফিসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবসা করা ছবি ছিল এটি। শাহরুখকে প্রথম সারির নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি দর্শককে এই ছবি উপহার দিয়েছিল ওই দশকের অন্যতম সেরা কিছু গান। কিন্তু 'দিওয়ানা' তৈরির পথ মসৃণ ছিল না।
সম্প্রতি ইউটিউব চ্যানেল স্টোরিজ বাই শেখর-এ এ ছবি নির্মাণের নেপথ্যের অজানা তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। পরিচালকের সরে দাঁড়ানো, নায়কের আকস্মিক বিদায় এবং শুরুতে শাহরুখ খানের অনীহা—সেসব গল্প উঠে এসেছে সেখানে।
ঘটনার সূত্রপাত প্রযোজক গুড্ডু ধানোয়াকে কেন্দ্র করে। ১৯৮৯ সালে তার প্রযোজিত 'গোলা বারুদ' ছবিটি বক্স অফিসে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়। সেই বিপুল ক্ষতির ধাক্কা সামলে দুই অংশীদার সঙ্গী ললিত কপূর ও রাজু কোঠারিকে নিয়ে ভাগ্য ফেরানোর মতো ভালো প্রজেক্ট খুঁজছিলেন গুড্ডু। একবার চেন্নাইয়ে গিয়ে তামিল ছবি 'বসন্ত রাগম' দেখে সেটি হিন্দিতে রিমেক করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই রিমেকই পরে 'দিওয়ানা' হয়ে ওঠে। কাকতালীয়ভাবে, মূল ছবির পরিচালক ছিলেন তামিল অভিনেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী 'থালাপতি' বিজয়ের বাবা, আর প্রযোজক ছিলেন বিজয়ের মা শোভা।
মাধুরী দীক্ষিতের বদলে দিব্যা ভারতী
প্রথমে নায়িকার চরিত্রের জন্য মাধুরী দীক্ষিতকে নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন নির্মাতারা। কিন্তু তার শিডিউল না মেলায় কারণে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এরপর দিব্যা ভারতীকে চূড়ান্ত করা হয়। রবির চরিত্রের জন্য ঋষি কপূর ও দ্বিতীয় নায়ক হিসেবে আরমান কোহলিকে সই করানো হয়।
ছবির সংগীতের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। 'দিল হ্যায় কে মানতা নাহি' ছবির গানে মুগ্ধ হয়ে গুড্ডু ধানোয়া সুরকার জুটি নাদিম-শ্রাবণের কাছে যান। সেই সিদ্ধান্তই পরে তুরুপের তাস বনে যায়। কারণ, পরে গানই হয়ে উঠেছিল 'দিওয়ানা'-র অন্যতম বড় শক্তি।
মাঝপথে পরিচালকের বিদায়
জোরকদমে যখন প্রস্তুতি চলছে, তখনই বড় ধাক্কা খায় এই প্রজেক্ট। মূল পরিচালক এস এ চন্দ্রশেখর প্রযোজকদের জানিয়ে দেন, তিনি অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছবিটি আর পরিচালনা করতে পারবেন না। আচমকাই পরিচালকহীন হয়ে পড়ে এই রিমেক।
এরপর ধানোয়া দ্বারস্থ হন রাজ কানওয়ারের। 'ঘায়েল' ছবিতে রাজকুমার সন্তোষীর প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। নিজের প্রথম ছবি পরিচালনার সুযোগ খুঁজছিলেন কানওয়ার। তাই এ ছবির দায়িত্ব নিতে রাজি হয়ে যান। ছবির পরিচালক তো পাওয়া গেল, কিন্তু সমস্যা তখনও মেটেনি।
আরমান কোহলির সরে দাঁড়ানো
সব চেয়ে বড় ধাক্কা আসে, যখন নির্মাতাদেরই আরেক ছবির প্রযোজনা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে 'দিওয়ানা' থেকে সরে যান আরমান কোহলি। ছবির দ্বিতীয় নায়ককে হারিয়ে বিপাকে পড়ে পুরো টিম। তড়িড়িড়ি শুরু হয় নতুন কাউকে খোঁজার কাজ।
সমস্যা মেটে গুড্ডু ধানোয়া ও চিত্রপরিচালক শেখর কাপুরের এক আলাপের সূত্র ধরে। ছবির এই কাস্টিং-সংকট নিয়ে আলোচনার সময়েই শেখর এক তরুণ টেলিভিশন অভিনেতার নাম প্রস্তাব করেন। 'ফৌজি' ও 'সার্কাস'-এর মতো ধারাবাহিকের বদৌলতে ততদিনে বেশ জনপ্রিয়তা হয়ে উঠেছেন সেই তরুণ। সেই অভিনেতাটি শাহরুখ খান।
শুরুতে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন শাহরুখ
ধানোয়া ও রাজ কানওয়ার দিল্লিতে গিয়ে দেখা করেন শাহরুখের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, তরুণ অভিনেতা তত দিনে পাঁচটি ছবিতে সই করে ফেলেছেন—'দিল আশনা হ্যায়', 'কিং আঙ্কল', 'কাভি হাঁ কাভি না', 'রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান' ও 'চমৎকার'। ডেট না থাকায় প্রথমে 'দিওয়ানা'-র প্রস্তাব ফিরিয়েই দিয়েছিলেন শাহরুখ।
তবে দিন কয়েকের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলায়। অন্য একটি ছবির কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় শাহরুখের হাতে কিছুটা সময় ফাঁকা হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত বদলে ছবির চিত্রনাট্য শুনতে রাজি হন তিনি। চরিত্রটির বিদ্রোহী সত্তা তাকে আকর্ষণ করে। পাশাপাশি বিধবা বিবাহের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছবির আবেগঘন প্রেক্ষাপটও তার মন ছুঁয়ে যায়। সেই সময়ে মূলধারার হিন্দি ছবিতে এমন কাহিনি বেশ বিরল ছিল।
অন্যান্য ছবির আগে মুক্তি পায় 'দিওয়ানা'
মজার ব্যাপার হলো, 'দিওয়ানা'র আগে পাঁচটি ছবিতে সই করলেও এটিই শাহরুখের প্রথম ছবি হিসেবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। ১৯৯২ সালের ২৫ জুন মুক্তি পায় ছবিটি। সে বছর বক্স অফিসে 'বেটা'র পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবসা সফল ছবি হিসেবে জায়গা করে নেয় 'দিওয়ানা'।
ছবিটির গান দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন ফেলে দেয়। শ্রোতাদের মন কেড়ে নেয় 'তেরি উমিদ তেরা ইন্তেজার', 'সোচেঙ্গে তুমহে পিয়ার করেঁ কি নাহি', 'অ্যায়সি দিওয়ানগি'। ছবিটিতে সুর দিয়ে ওই বছর একাধিক সেরা পুরস্কার ওঠে নাদিম-শ্রাবণের হাতে। অন্যদিকে 'সোচেঙ্গে তুমহে'র জন্য সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কার জিতে নেন কুমার শানু।
শাহরুখের মোটরসাইকেল এন্ট্রি
ছবি প্রদর্শনের সময় দর্শকের উন্মাদনা দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন গুড্ডু ধানোয়া। পর্দায় মোটরবাইক হাঁকিয়ে শাহরুখ প্রবেশ করতেই উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন দর্শক, রুপালি পর্দার দিকে ছুড়েছিলেন খুচরো পয়সা। সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসই এক নতুন তারকার আগমনী বার্তা দিয়ে গিয়েছিল।
এই ছবির হাত ধরেই সেরা নবাগত অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতেন শাহরুখ। শুরু হয় তার নতুন ক্যারিয়ার, যা কালক্রমে বদলে দেয় হিন্দি সিনেমাকেই। প্রযোজক হিসেবে গুড্ডু ধানোয়া এবং সফল পরিচালক হিসেবে রাজ কানওয়ারকেও প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল এই ছবি।
সমাপ্তি বদলাতে রাজি হননি নির্মাতারা
মজার বিষয় হলো, ছবিটি মুক্তির ঠিক আগে এর ক্লাইম্যাক্স বদলে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল নির্মাতাদের। 'দিওয়ানা'র পরিবেশক ছিলেন প্রবীণ চিত্রনির্মাতা মনমোহন দেশাই। তার মনে হয়েছিল, কাজল শেষপর্যন্ত শাহরুখ অভিনীত চরিত্র রাজার সঙ্গে থেকে যাবে, এই পরিণতি দর্শক মেনে নেবে না।
মনমোহনের যুক্তি ছিল, যেহেতু কাজলের প্রথম স্বামী ছিল ঋষি কাপুর অভিনীত চরিত্র রবি, তাই সে ফিরে আসার পর তার সঙ্গেই কাজলের মিলন হওয়া উচিত। এমনকি শাহরুখের চরিত্রটিকে মেরে ফেলে রবিকে বাঁচিয়ে রাখারও পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু এই যুক্তির সঙ্গে একমত হননি প্রযোজক গুড্ডু ও পরিচালক রাজ। তাদের বিশ্বাস ছিল, কাজল যদি রবির কাছেই ফিরে যায়, তবে বিধবা বিবাহ নিয়ে এই ছবির যে মূল বার্তা সেটি গুরুত্ব হারাবে। প্রবীণ নির্মাতার পরামর্শ সত্ত্বেও নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন দুজনে। শেষ পর্যন্ত সেই অপরিবর্তিত ক্লাইম্যাক্স নিয়েই মুক্তি পায় ছবিটি।
তিন দশকেরও বেশি সময় পর 'দিওয়ানা' নির্মাণের নেপথ্য কাহিনি আজও বলিউডের অন্যতম বড় এক 'যদি এমন না হতো' গল্প। আরমান কোহলি যদি সরে না দাঁড়াতেন, রাজ কানওয়ার যদি পরিচালনার হাল না ধরতেন, কিংবা শাহরুখের হাতে যদি হঠাৎ সময় না বেরোত—তবে হয়তো হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তম সুপারস্টারের পথচলার শুরুটা একেবারেই অন্য রকম হতে পারত।
