পারস্য উপসাগরে বিশাল নৌবহর, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি…আবারও কি ইরানে হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র?
চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, 'সাহায্য আসছে'। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ধীরে ধীরে, স্থিতিশীল এবং দৃশ্যমানভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর দেশ যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানে হামলা চালাতে সক্ষম, তা তারা আগেই দেখিয়েছে। গত জুনে 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
ওই অভিযানে অংশ নেয় ১০০টির বেশি বিমান। এর মধ্যে ছিল বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নির্ভুল নিশানায় 'বাংকার-বাস্টার' বোমা নিক্ষেপ করে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবার ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে। তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে কোনো চুক্তিতে না পৌঁছালে 'পরবর্তী হামলা হবে আরও ভয়াবহ'।
ট্রাম্প দাবি করেন, একটি 'বিশাল আর্মাডা' (নৌবহর) ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় যেভাবে নিকোলাস মাদুরোকে আটকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তেমনি এই বাহিনীও 'প্রস্তুত, ইচ্ছুক এবং প্রয়োজনে দ্রুত ও সহিংসভাবে তাদের মিশন শেষ করতে সক্ষম'।
তিনি ইরানকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও বলেন, 'সময় ফুরিয়ে আসছে।'
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন আছেন। এর মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতেই রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার সেনা। এছাড়া জর্ডান, সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে।
গত কয়েক সপ্তাহে 'ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স'-এর (উন্মুক্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য) তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে আরও মার্কিন সামরিক বিমান পৌঁছানোর খবর পাওয়া গেছে।
রোববার তোলা ছবিতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির সীমানার ভেতরে নতুন কিছু কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তেহরান আল-উদেইদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণকারীদের মতে, এখন সেখানে নতুন বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বসানো হচ্ছে।
পেন্টাগন সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তরের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। তবে বিবিসি ভেরিফাই এফ-১৫ যুদ্ধবিমান এবং আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমানের আগমন শনাক্ত করেছে।
ফ্লাইটরাডার২৪ ওয়েবসাইটে ইরানের আকাশসীমার কাছাকাছি ড্রোন ও পি-৮ পোসাইডন গুপ্তচর বিমানের চলাচলও দেখা গেছে।
এছাড়া পরিবহন বিমানও সেখানে পৌঁছেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব বিমানে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আনা হয়েছে। এর অর্থ হতে পারে, ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দিলে সম্ভাব্য পাল্টা হামলা থেকে নিজেদের ও উপসাগরীয় মিত্রদের রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ব্রিটেনও 'আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করতে' ওই অঞ্চলে টাইফুন যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন পাঠিয়েছে।
মার্কিন বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা সেখানে 'অপারেশন অ্যাজাইল স্পার্টান' নামে বড় একটি সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো 'ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় যুদ্ধবিমান দ্রুত মোতায়েন, ছড়িয়ে দেওয়া ও ধরে রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন করা'।
জাহাজ চলাচল বিশ্লেষক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য শেয়ারকারী স্টিফান ওয়াটকিন্স জানান, তিনি সম্প্রতি বেশ কয়েকটি মার্কিন আগাম সতর্কতা ও গুপ্তচর বিমানের আগমন শনাক্ত করেছেন। 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার'-এর সময়ও এসব বিমান ওই অঞ্চলে ছিল। এর মধ্যে রয়েছে আরসি-১৩৫, ই-১১এ বিএসিএন এবং ই-৩জি সেন্ট্রি।
ওয়াটকিন্স বলেন, এসব তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হামলা 'দেরিতে নয়, বরং খুব শিগগিরই হতে পারে'।
এছাড়া ওই অঞ্চলে একটি মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের আগমনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন আগে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ছিল। পরে সেটিকে ঘুরিয়ে উপসাগরের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
যদিও বিমানবাহী রণতরীটি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রকাশ্যে তার অবস্থান জানায়নি, তবে সোমবার ফ্লাইটরাডার২৪-এ একটি অসপ্রে বিমানের গতিপথ দেখা গেছে। বিমানটি উপসাগরের একটি অফশোর (সাগরপাড়) এলাকা থেকে ওমানে অবতরণ করে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সম্ভবত ওমানের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রতীক। এর সঙ্গে প্রায় ৭০টি যুদ্ধবিমানের একটি এয়ার উইং থাকে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে রয়েছে আধুনিক এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান, যা শত্রুপক্ষের রাডার এড়িয়ে চলতে সক্ষম।
এই স্ট্রাইক গ্রুপে টমাহক ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল বহনকারী তিনটি ডেস্ট্রয়ারও রয়েছে। সাধারণত এর সঙ্গে একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থাকে, যেটিও একই ধরনের অস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে।
এসব জাহাজ ওই অঞ্চলে আগে থেকেই থাকা দুটি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের সঙ্গে যুক্ত হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, 'আমাদের একটি বড় নৌবহর ওই অঞ্চলে যাচ্ছে। এখন আমরা দেখব কী ঘটে।'
সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু
প্রতিরক্ষা বিষয়ক থিংক ট্যাংক রুসি-এর মিলিটারি সায়েন্সেস বিভাগের পরিচালক ম্যাথিউ সেভিল বলেন, বর্তমান সামরিক অবস্থান বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র 'সম্ভবত ইরানের প্রায় যেকোনো জায়গায় হামলা চালাতে পারবে'। তবে মাটির অনেক গভীরে থাকা স্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রে বি-২ বোমারু বিমানের প্রয়োজন হতে পারে।
ট্রাম্প নির্দেশ দিলে যুক্তরাষ্ট্র কী লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে—সে বিষয়ে সেভিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে একাধিক বিকল্প রয়েছে।
তার মতে, প্রথম লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সামরিক সক্ষমতা, 'যেমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি বা উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি'। এতে ইরানের পাল্টা হামলা চালানোর ক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
ইরানের কাছে এখনো স্বল্প পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দীর্ঘ পাল্লার ড্রোনের বড় মজুত রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা উদ্বিগ্ন। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা আর মার্কিন হামলা সমর্থন করবে না।
আরেকটি বিকল্প হতে পারে সরাসরি ইরান সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করা।
সেভিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র 'ইরানের সামরিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারে'। এর মধ্যে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং বিক্ষোভ দমনে যুক্ত মিলিশিয়াদের ঘাঁটিও থাকতে পারে।
তবে ইরানের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল হবে বলে তিনি মনে করেন।
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ইসরায়েল জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল। সে সময় দেহরক্ষীদের গতিবিধি অনুসরণ করে অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এরপর থেকে ইরান তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে এবং নেতারা এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করছেন।
সেভিলের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র 'হয়তো শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের হত্যা করতে পারবে, কিন্তু এর সামগ্রিক প্রভাব কী হবে, তা নিশ্চিত নয়'।
তিনি আরও বলেন, 'আমরা হয়তো বর্তমান সরকারের পতনের শেষ অধ্যায় দেখছি। তবে সমস্যা হলো, সেটি ঘটতে মাসের পর মাস, এমনকি বছরও লেগে যেতে পারে।'
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, প্রয়োজনে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়ানোর ইচ্ছা তার নেই।
এ পর্যন্ত তার সামরিক হস্তক্ষেপগুলো ছিল স্বল্পমেয়াদি, তীব্র এবং সীমিত পরিসরের।
তিনি কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। সে ক্ষেত্রে ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হতে হবে।
ম্যাথিউ সেভিলের মতে, ট্রাম্পকে এখন 'নিজেকে কঠোর সিদ্ধান্তগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থাপন করার আকাঙ্ক্ষা এবং বাস্তবে একটি নির্ণায়ক ফল অর্জনের সম্ভাবনার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হচ্ছে'।
