কাঁচামাল আমদানিতে বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনে এগ্রোকেমিক্যাল উৎপাদনকারীদের অভিযোগ
বালাইনাশকের কাঁচামাল আমদানিতে 'সিঙ্গেল কান্ট্রি, সিঙ্গেল সোর্স' আরোপ করে দেওয়া সাত বছরের পুরোনো একটি নীতি বিদ্যমান আইন লঙ্ঘন করছে এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছে বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন (বামা)। ২২ জুলাই এ অভিযোগের ওপর শুনানি হতে পারে।
সমিতির অভিযোগ, পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির (পিটিএসি) সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০১৮ সাল থেকে এই বিধিনিষেধ কার্যকর করে আসছে। এর ফলে স্থানীয় প্রস্তুতকারকরা আরও প্রতিযোগিতামুলক দরে বিভিন্ন দেশ থেকে মানসম্পন্ন কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
'সিঙ্গেল কান্ট্রি, সিঙ্গেল সোর্স' নীতিমালার আওতায়, উৎপাদনকারীদের একটি সুনির্দিষ্ট দেশের সুনির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। একই কাঁচামাল অন্য দেশ বা অন্য কোনো কোম্পানি থেকে কম দামে আমদানির সুযোগ থাকলেও তা আমদানি করা যাবে না।
বামা বলেছে, পেস্টিসাইডস আইন, ২০১৮, দ্য পেস্টিসাইডস রুলস, ১৯৮৫ ও বালাইনাশক বিধিমালা ২০১০-এর কোনোটিতে উৎস পূর্ণ বা সাময়িক বন্ধ রাখার বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশনা নেই।
সমিতি আরও বলেছে, এই নীতি আমদানি নীতি আদেশ ২০২২-এর সাথেও সাংঘর্ষিক। আমদানি নীতি আদেশে অন্তত দুটি দেশের তিনটি সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য আমদানিকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
সমিতির প্রেসিডেন্ট মো. মোস্তাফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, দু-একটি বহুজাতিক কোম্পানি ও আমদানিকারকদের সুবিধা দিতে 'বেআইনিভাবে' কাঁচামাল আমদানিতে এসব বাধা আরোপ করা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'এগ্রোকেমিক্যালের কাঁচামাল আমদানিতে সিঙ্গেল কান্ট্রি সিঙ্গেল সোর্স নীতি আরোপ করায় প্রতিযোগিতামুলক দরে বৈশ্বিক বাজার থেকে মানসম্পন্ন কাঁচামাল আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না।
'কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এসব বাধা দূর করতে পিটিএসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে চিঠি দিলেও তারা তা মানছে না। এ অবস্থায় আমরা বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছি।''
বিরোধের কারণ
পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির ৬৯তম ও ৭৭তম সভার কিছু সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ। ওই সভাগুলোতে কাঁচামালের উৎস সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে নিবন্ধিত বালাইনাশকের কাঁচামালের উৎস পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার শর্ত যুক্ত করা হয়।
এগ্রোকেমিক্যালস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সুপারিশ সরকার বা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে দেওয়া এক চিঠিতে কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছিল, বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে আমদানির উৎস স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিধান নেই।
মন্ত্রণালয় বলেছে, তারপরও পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির সভায় যথাক্রমে উৎস বন্ধ রাখা এবং নিবন্ধন প্রাপ্তির ২ বছর পর পরিবর্তনের ব্যবস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বোধগম্য নয়।
মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটি গঠন করা হয়েছে সরকারকে সুপারিশ প্রদানের জন্য। তাদের সিদ্ধান্ত কেবল মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই বাস্তবায়ন করার কথা।
দেশীয় বালাইনাশক উৎপাদনকারীদের কাঁচামাল ও সহযোগী উপাদান আমদানির জন্য উৎস উন্মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় থেকে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।
এগ্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন আরও অভিযোগ করেছে, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত পেস্টিসাইডস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির ৭৭তম সভায় একক সোর্স নীতি তথা উৎস নির্দিষ্টকরণের জন্য আমদানিকৃত বালাইনাশক মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, রেজিস্টার্ড বালাইনাশকের উৎস পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার দুই বছর পর ল্যাব টেস্টের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষার মাধ্যমে উৎস পরিবর্তন করা যাবে।
এগ্রোকেমিক্যালস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, যেহেতু মাঠ পর্যায়ে কাঁচামালের পরীক্ষা সম্ভব নয়, তাই এই শর্তের কারণে কাঁচামাল আমদানির উৎস পরিবর্তনের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
সমিতি আরও অভিযোগ করেছে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ট্রিপস চুক্তির আওতায় ওষুধ ও এগ্রোকেমিক্যাল আমদানিতে বাংলাদেশের পেটেন্ট সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু ফিনিশড পণ্য আমদানিকারকদের এ সুবিধা দেওয়া হলেও দেশীয় উৎপাদনকারীদের এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার এগ্রোকেমিক্যাল উৎপাদন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বেশিরভাগ পণ্যের কাস্টমস শুল্ক শূন্যে নামিয়ে এনেছে। তবে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা বলছেন, কাঁচামাল আমদানিতে 'সিঙ্গেল কান্ট্রি, সিঙ্গেল সোর্স' নীতি বহাল থাকায় তারা এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে মানসম্পন্ন কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না।
বাংলাদেশের বালাইনাশকের বাজার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। এর প্রায় ৯২ শতাংশই বহুজাতিক কোম্পানি ও ফিনিশড পণ্য আমদানিকারকদের দখলে। দেশে বালাইনাশক উৎপাদনের জন্য সরকার ২২টি এগ্রোকেমিক্যাল প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে অনুমোদন দিয়েছে, তবে বাজারে তাদের সম্মিলিত হিস্যা মাত্র ৮ শতাংশ।
আগে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাঁচামাল আমদানিতে মোট করের পরিমাণ ছিল ৫৮ শতাংশ। সর্বশেষ বাজেটে বিএনপি সরকার মাত্র ৩৬টি পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রেখে বাকি সব কাঁচামালের ওপর শুল্ক শূন্যে নামিয়ে এনেছে।
