সরকারি নির্মাণকাজের রেট শিডিউল একীভূত ও বাজারভিত্তিক করা হচ্ছে
সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণকে আরও বাস্তবসম্মত, আধুনিক ও কার্যকর করতে রেট শিডিউল হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে একটি অভিন্ন রেট শিডিউল কাঠামো প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডায়নামিক রেট শিডিউল চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে নির্মাণসামগ্রী, শ্রম ও অন্যান্য ব্যয়ের পরিবর্তন দ্রুত প্রতিফলিত হয়।
সরকারি নির্মাণকাজের ব্যয় নির্ধারণকে আরও বাস্তবভিত্তিক, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী করতে রেট শিডিউল মূল্যায়ন ও পুনঃনির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত ওয়ার্কিং কমিটির প্রথম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ২২ জুন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহামদ।
নিয়মিত উপাদানভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণের পাশাপাশি ব্যয়ের তালিকা তৈরি, হালনাগাদ ও পরিচালনার জন্য একটি ওয়েব-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের সম্ভাব্যতা যাচাই করার বিষয়েও কমিটি একমত হয়েছে।
রেট শিডিউল হলো কোনো নির্মাণ বা প্রকৌশল কাজের প্রতিটি আইটেম—যেমন ইটের কাজ, কংক্রিট, রড, শ্রম, পরিবহন ইত্যাদি সম্পন্ন করতে কত খরচ হবে তার একটি নির্ধারিত তালিকা। বাংলাদেশে সরকারি নির্মাণ খাতে রেট শিডিউল মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) প্রণীত কাঠামোকে ভিত্তি করে পরিচালিত হলেও, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ (পাউবো) বিভিন্ন সংস্থা নিজস্বভাবে তা ব্যবহার বা সংশোধন করে। ফলে পূর্ণাঙ্গ একক ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ রেট শিডিউল স্থির হওয়ায় বাজারদর, শ্রম ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্য পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে না। এর ফলে প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন অনেক সময় অবাস্তব হয়ে পড়ে এবং পরে সংশোধনের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি ম্যানুয়াল বা এক্সেল-নির্ভর পদ্ধতি, সংস্থাভেদে রেটের পার্থক্য, নতুন খাত (যেমন গ্রিন বিল্ডিং বা ইন্টেরিয়র কাজ) অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি এবং রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবহারের অভাবে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়।
গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নির্মাণকাজের রেট শিডিউল পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রম তদারকির জন্য অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রতিনিধিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন।
ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পরিবেশবান্ধব ও উদীয়মান খাতগুলোর জন্য পৃথক রেট কাঠামো বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে উপকরণ, শ্রম, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য উপাদান বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবভিত্তিক রেট নির্ধারণ করা হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রতিটি সংস্থাকে নিজস্ব সাব-কমিটি গঠন করে বিদ্যমান রেট শিডিউল পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কবির আহামদ সভায় উল্লেখ করেন, নির্মাণসামগ্রী, শ্রম ও যন্ত্রপাতির মূল্য ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়ায় বর্তমান স্থির রেট শিডিউল অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব ব্যয় প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই একটি ইনডেক্স-ভিত্তিক একীভূত রেট শিডিউল প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
সভায় বাজারভিত্তিক ডায়নামিক ব্যয়ের তালিকা চালুর সুপারিশ করে এলজিইডি। অন্যদিকে সওজের পক্ষ থেকে বলা হয়, রেট নির্ধারণে ভোক্তা মূল্যসূচক, নির্মাণ সামগ্রীর বাজারদর, শ্রম ও পরিবহন ব্যয়, ভ্যাট ও আয়করসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনা করা উচিত।
স্থাপত্য অধিদপ্তর বর্তমান রেট শিডিউলে ল্যান্ডস্কেপিং, ইন্টেরিয়র কাজ, আসবাবপত্র ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণের সীমিত উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে এবং এসব খাতের জন্য পৃথক রেট সেগমেন্ট প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়। এছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআইডব্লিউটিএ, পাউবো, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা জানান, প্রকল্পের প্রকৃতি অনুযায়ী তাদের নিজস্ব রেট নির্ধারণ পদ্ধতি থাকায় বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এছাড়া নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করার আগে ঠিকাদার, উপকরণ সরবরাহকারীসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। সভায় আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অন্তত ২-৩টি দেশের রেট নির্ধারণ পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হবে এবং নির্মাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিতের পাশাপাশি কাজের গুণগত মান বজায় রাখা হবে।
ওয়ার্কিং কমিটির একজন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সরকারের বর্তমান রেট অতিরঞ্জিত নাকি সেকেলে—এ নিয়ে যে পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে, তা নিরসন করাই এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য।
ওই সদস্য আরও বলেন, 'রেট শিডিউল নিয়ে এখন অনেক আলোচনা হচ্ছে। কেউ বলছে এটা ওভাররেটেড, কেউ আবার ভিন্ন মত দিচ্ছে। তবে আমরা পুরো বিষয়টিকে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে আমরা কয়েকটি মিটিং করেছি এবং সামনে আরও মিটিং করার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ আমাদের জন্য একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করছে, যা আমরা বিস্তারিত পর্যালোচনা করব। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এক্সপার্টদের সঙ্গে বসব এবং বিভিন্ন বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করব।'
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বরাদ্দগুলো প্রচলিত বাজারদরের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে কি না এবং রেট হিসাবের জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো এখনও কার্যকর কি না, তা-ও পর্যালোচনা করছে কমিটি।
প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি আগামী ২৩ জুলাই কারিগরি প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার জন্য বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। এই মূল্যায়নের পর সংশোধিত রেট শিডিউল অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন করা হবে।
