চিকিৎসার আড়ালে আদ-দ্বীন হাসপাতাল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছে: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা, সেন্ট্রাল এসি বন্ধ রাখা, অক্সিজেনের অভাব এবং চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, চিকিৎসার আড়ালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছে এবং রোগীদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সরকার দেশের স্বাস্থ্য খাতে কোনো ধরনের অবহেলা বা বিশৃঙ্খলা সরকার বরদাশত করবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
আজ রোববার (২৮ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, 'গত মে মাসে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চরম অবহেলা এবং অসতর্কতার কারণে ছয়টি মায়ের বুক খালি হয়েছে। হাইপারক্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যখন শিশুগুলোর হাত-পা কাঁপছিল, তখন সেখানে এসি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কোনো সচল জানালা ছিল না এবং ছিল না কোনো জরুরি অক্সিজেন সাপোর্ট। ১৬ থেকে ১৭ জন মা যখন তাদের সন্তানদের বাঁচানোর জন্য চত্বরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটাছুটি করছিলেন, তখন সেখানে কোনো অন-ডিউটি ডাক্তার পাওয়া যায়নি, এমনকি নার্সরাও ডাকলে সাড়া দেননি। কার্বন ডাই অক্সাইডের বিষক্রিয়া ও ছটফট করতে করতে নিরীহ শিশুগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।'
তিনি জানান, ঘটনার পরদিন তিনি নিজে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে গুরুতর অবহেলার প্রমাণ পান। কিন্তু এত বড় ঘটনার পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিহত শিশুদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি বা ন্যূনতম সহমর্মিতাও দেখায়নি।
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরেই কর্তৃপক্ষ বাণিজ্যিক বেকারি স্থাপন করেছে। সেই বেকারির বর্জ্য, স্তূপ করে রাখা প্লাস্টিক এবং জলাবদ্ধতার কারণে হাসপাতালের পুরো পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। এই পরিবেশ দূষণ থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাসও শিশুদের মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিপুল পরিমাণ দাহ্য প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে রাখা হয়েছে। সেখানে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটলে রোগী ও স্বজনদের নিরাপদে বের হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। এসব গুরুতর অনিয়ম ও লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে ইতিমধ্যে সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স স্থগিত করেছে, পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে এবং সরকারি তদারকিতে নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিয়োগ দিয়েছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের জীবন রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে এবং দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে কঠোর শৃঙ্খলার আওতায় আনা হবে।
সংসদে বিরোধী দলের এক সদস্যের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নাজমের আয়াত উল্লেখ করে বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) ওহির ভিত্তিতেই কথা বলেছেন। কিন্তু 'ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে'—এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া চরম শিরকের শামিল এবং যারা এমন কথা বলেন, তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।
প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব আহরণ নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে অর্থনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরেছিলেন, এবারের বাজেট মূলত সেই দর্শনেরই প্রতিফলন। তিনি ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় ভ্যাট চালুর উদাহরণ টেনে বলেন, তখনও এর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে ভ্যাট ছাড়া দেশের অর্থনীতি কল্পনাও করা যায় না।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য 'ফ্যামিলি কার্ড', কৃষকদের জন্য 'ফার্মার্স কার্ড' এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে 'হেলথ কার্ড' চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেম ও প্লাগ অ্যান্ড প্লে সুবিধা চালু করা হয়েছে, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা দ্রুত শিল্প কারখানা স্থাপন করতে পারেন।
পরিবেশ সুরক্ষায় 'ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি' কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে ৫২টি ওষুধের কাঁচামাল, ক্যানসার চিকিৎসা ও কিডনি ডায়ালাইসিস যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। পাশাপাশি ঘাটতি বাজেট নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো দেশই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে ঘাটতিবিহীন বাজেট করে না; প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখতে এটি একটি স্বীকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
