লক্ষ্মীপুরে কোরবানির পশুর চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের অনীহা
লক্ষ্মীপুরে সরকার নির্ধারিত দামে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির কোনো লক্ষণ নেই; উল্টো চামড়া কেনায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চরম অনীহা দেখা গেছে। ফলে দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকার গরুর চামড়াও মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না।
বাধ্য হয়ে অনেকে চামড়া এতিমখানা ও মাদরাসায় দান করে দিলেও ক্রেতার অভাবে সেগুলো বিক্রি করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।
ঈদের দিন বিকেলে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাঝারি থেকে বড় আকারের চামড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক এলাকায় দুপুর গড়িয়ে গেলেও কোনো ক্রেতার দেখা মেলেনি। নিরুপায় হয়ে বেশির ভাগ মানুষ চামড়া স্থানীয় এতিমখানা ও মাদরাসায় দান করেছেন।
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার উত্তর চর লরেঞ্চ মদিনাতুল মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মাকসুদুল হক জানান, ঈদের দিন তারা প্রায় ৩০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। সারা দিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের পর সন্ধ্যায় এক ক্রেতা ৩৪০ টাকা দরে চামড়াগুলো কিনে নেন। তবে তিনি জানান, অনেক ছোট মাদরাসা তাদের সংগ্রহ করা চামড়া বিক্রি করতে পারেনি।
লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের একটি মাদরাসা প্রায় ৩০টি চামড়া সংগ্রহ করে বিপাকে পড়ে। দুপুরে ইসলাম মার্কেটের এক আড়তদারের সঙ্গে প্রতিটি চামড়া ৪২০ টাকা দরে বিক্রির চুক্তি হয়। আড়তদারের গাড়ি পাঠিয়ে চামড়াগুলো নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও সন্ধ্যায় তিনি চামড়া কিনতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ চামড়াগুলো আর কোথাও বিক্রি করতে পারেনি।
লক্ষ্মীপুর শহরের চামড়া আড়তের মালিক মোহাম্মদ বক্স আলী জানান, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে শ্রমিকসংকট এবং ট্যানারিতে বিক্রি করতে না পারায় তিনি চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন।
বক্স আলী জানান, যে চামড়া আগে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। চামড়া সংরক্ষণের কেমিক্যালের দামও বেড়েছে। এবারের ঈদে ১০ হাজার পিস চামড়া কেনার লক্ষ্য থাকলেও শ্রমিকসংকট এবং ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহের কারণে চামড়া কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি।
তিনি অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষুদ্র আড়তদারদের কোনো সুবিধা না দিয়ে মাদরাসাগুলোতে লবণ সরবরাহ করছে। কিন্তু মাদরাসাগুলো চামড়ায় লবণ না লাগিয়ে তা বাইরে বিক্রি করে দেয়। বেশি দামের আশায় লবণ ছাড়া কাঁচা চামড়া গভীর রাত পর্যন্ত জমিয়ে রাখায় চামড়ায় পচন ধরে এবং এর মান ও দাম দুটোই কমে যায়।
উত্তর তেমুহনীর আরেক আড়তদার মো. হারুনও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, মাদরাসাগুলো লবণ না লাগিয়ে চামড়া ফেলে রাখায় সেগুলোর মান নষ্ট হয়ে যায় এবং দামও থাকে না। অন্যদিকে সরকার আড়তদারদের কোনো লবণ দিচ্ছে না।
চামড়ার কদর কমার পেছনে ট্যানারি মালিকদেরও দায়ী করেন হারুন। তিনি বলেন, 'চামড়া কেনার পর তা বিক্রি করার কোনো ক্রেতা পাচ্ছি না। ট্যানারিতে চামড়া দিলেও টাকা বকেয়া থাকে। ধারদেনা করে চামড়া কিনে আমাদের বিপাকে পড়তে হয়। গত বছর ট্যানারিতে যে চামড়া সরবরাহ করেছিলাম, তার টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, চামড়া সংরক্ষণের ব্যয় বাড়লেও প্রতিবছরই এর দাম কমছে। একেকজন শ্রমিকের পেছনে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। ৬০০ টাকার লবণের বস্তা ঈদে ৭০০ টাকা হয়ে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে প্রতিবছর লাভের বদলে উল্টো লোকসান গুনতে হচ্ছে।
