প্রতিষ্ঠার ১২৫ বছর পর চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চালু হলো কিডনি ডায়ালাইসিস
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ১২৫ বছর পর প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে কিডনি ডায়ালাইসিস সুবিধা। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই জীবনরক্ষাকারী সেবাটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়ার পথ সুগম হলো। সল্প আয়ের রোগীদের জন্য এই উদ্যোগ আশার আলো দেখালেও চাহিদার তুলনায় সরঞ্জামের স্বল্পতা নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিদিন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে কিডনি জটিলতা নিয়ে অসংখ্য রোগী ভর্তি হন। বিশেষ করে হাসপাতালের ১৮ শয্যা বিশিষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা রোগীদের একটি বড় অংশের নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালে এই সুবিধা না থাকায় রোগীদের নগরীর দামি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে পাঠাতে হতো। ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে অনেক রোগী মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতেন, যা অনেকের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াত। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালেই এই সেবা চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
আইসিইউতে ভর্তি এক রোগীর স্বজন রহিমা বেগম টিবিএসকে বলেন, "আগে অন্য জায়গায় চিকিৎসকরা পাঠিয়ে দিতেন, এতে অনেক টাকা খরচও হতো। কিন্তু এখন এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে সরকারি হাসপাতালেই।"
জহিরুল ইসলাম নামে আরেক রোগীর অভিভাবক জানান, "পুরো ইউনিট চালু করা হলে আমাদের অন্য কোনো জায়গায় যাওয়া লাগবে না। এখানে একটি মেশিন দিয়ে কাজ পরিচালনা করছে, আরও কয়েকটি মেশিন থাকলে আমাদের এখানেই সব সেবা মিলবে।"
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, আপাতত পরীক্ষামূলকভাবে একটি মেশিন দিয়েই ডায়ালাইসিস কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এই হেমোডায়ালাইসিস মেশিন এবং আরও প্লান্টসহ প্রায় ২৪ লাখ টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম একজন দানবীরের সহায়তায় পাওয়া গিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৫০ শতাংশের ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়, যা একটি মেশিন দিয়ে সামাল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আবদুল্লাহ্ আল মেহের নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, "বর্তমানে একটি মেশিন দিয়ে এই কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে করে জটিল এই রোগে আক্রান্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় বাকি রোগীদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। একাধিক মেশিন থাকলে আমাদের আর বাইরে যেতে হবে না।"
একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ ২০ বেডের ডায়ালাইসিস ইউনিট গড়ে তুলতে গত মার্চ মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেখানে আলাদা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স, লজিস্টিক সাপোর্ট ও প্রয়োজনীয় মেশিনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, "যে সমস্ত সংকটাপন্ন রোগী মৃত্যুঝুঁকিতে থাকেন এবং যাদের কিডনি সচল রাখতে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন, তাদের আমরা এখানে সেবা দিতে পারব। চট্টগ্রামে স্বল্প আয়ের মানুষরা বাঁচার তাগিদে এখানে আসেন। বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ ও ডায়ালাইসিসের ব্যয় অনেক বেশি, সেই তুলনায় সরকারি এই হাসপাতালে খুবই স্বল্প মূল্যে সেবাটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে।"
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেন টিবিএসকে বলেন, "একটি পূর্ণাঙ্গ ডায়ালাইসিস ইউনিট চালু করতে গেলে শুধু মেশিন নয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন। আমরা দানবীরের মাধ্যমে পাওয়া একটি মেশিন দিয়ে বর্তমানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করেছি।"
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে সরকারিভাবে কেবল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ২১ শয্যার ওয়ার্ডে কিডনি ডায়ালাইসিস সুবিধা চালু রয়েছে। এছাড়া বন্দর হাসপাতালে এই সুবিধা থাকলেও তা কেবল ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সীমাবদ্ধ। ফলে জেনারেল হাসপাতালে এই সেবা সম্প্রসারণ করা গেলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় এক বিশাল পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
