নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নতুন ৫০০ শয্যার ভবন উদ্বোধন, বাড়ছে স্নায়ুরোগ চিকিৎসার সক্ষমতা
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের নতুন ৫০০ শয্যার একটি ভবন উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ১,০০০ এ—যা এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় নিউরো হাসপাতালে পরিণত করেছে।
সোমবার (৮ ডিসেম্বর) ভবনটির উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।
হাসপাতল কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন ভবনে আজ মঙ্গলবার থেকে বহির্বিভাগ চালু হবে। চলতি মাসেই পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য ১০০ শয্যার ট্রমা সেন্টার, ১০০ শয্যার আইসিইউ ও নতুন অপারেশন থিয়েটার চালু হবে। পাশাপাশি যুক্ত হবে এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে নবনির্মিত প্রায় ৮০টি হাসপাতাল ভবন জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটে এখনো চালু হয়নি।
উচ্চমানের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ সাধারণ ভবনের তুলনায় বেশি জটিল ও ব্যয়বহুল জানিয়ে তিনি বলেন, "বায়োমেডিকেল টিমের সার্বক্ষণিক ব্যাকএন্ড সাপোর্ট না থাকলে মডুলার যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।"
তিনি বলেন, নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটটি শুধু সেবা প্রতিষ্ঠান নয়—বরং জাতীয় মান নির্ধারণ, প্রটোকল তৈরি এবং গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় সমস্যার সমাধান বের করাই এর মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত।
"এটি যেন কেবল একটি সার্ভিস হাসপাতাল না হয়, দেশের নিউরোসায়েন্সের গার্ডিয়ান হিসেবে যেন কাজ করে," যোগ করেন তিনি।
রেফারেল ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
অনুষ্ঠানে ডা. সায়েদুর রহমান আরও বলেন, রেফারেল ব্যবস্থার দুর্বলতায় রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেকটিতে ঘুরতে ঘুরতে জীবনঝুঁকিতে পড়েন। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে এমন ভিড় যে অনেক সময় দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। ভুল রেফারেল রোগীকে সরাসরি বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, "রোগী ফেরত দিলে পরবর্তী করণীয় অন্তত বলে দিতে হবে। দাঁতের সমস্যা বলে ডেন্টালে পাঠানো হলো, ডেন্টাল বলছে নেবে না; মাথায় আঘাত নিয়ে পাঠানো হলো অন্যত্র, রোগী মারা গেল—এ ধরনের অবহেলা চলতে পারে না।"
নতুন ভবন, নতুন নিয়োগ
নতুন ভবন চালুর সঙ্গে মিল রেখে ৮৫২টি পদে জনবল নিয়োগের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে, ইতোমধ্যে নিয়োগ পেয়েছেন ৬০ জন নার্স। ১৫তলা ভবনের তিনতলা বেজমেন্টে থাকবে পার্কিং ও সার্ভিস জোন, আর ওপরে থাকবে ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও ডায়াগনস্টিক ইউনিট।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এখানে সবচেয়ে বেশি আসেন স্ট্রোক ও দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক-জনিত আঘাতপ্রাপ্ত রোগী। পাশাপাশি পার্কিনসনস, ডিমেনশিয়া, জিবিএস, মৃগী, হাইড্রোকেফালাসসহ বিভিন্ন স্নায়ুরোগের রোগীও নিয়মিত চিকিৎসা নেন। ২০১২ সালে ৩০০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটিতে পরে আরও ২০০ শয্যা বাড়ানো হয়, তবে ক্রমবর্ধমান রোগীর চাপ কমেনি। নতুন ৫০০ শয্যা সেই সংকট অনেকটাই কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নির্মাণে বিঘ্ন, অবশেষে সমাপ্তি
২০১৮ সালে একনেক প্রকল্প অনুমোদনের পর ভবন নির্মাণের ঠিকাদারি পায় জিকে ট্রেডার্স। কিন্তু ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানের মালিক গ্রেপ্তার হওয়ায় ২১ মাস কাজ বন্ধ থাকে। ২০২১ সালে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন পুনরায় কাজ শুরু করে এবং বর্তমানে ভবনটি পুরোপুরি ব্যবহারযোগ্য।
সরকারি হাসপাতাল মানেই অপরিচ্ছন্নতা, সেবায় দেরি ও যন্ত্রপাতি অচল—এ ধারণার ব্যতিক্রম নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল। পরিচ্ছন্নতা, যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান ধরে রাখায় প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্ত টানা ছয়বার 'স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাতীয় পুরস্কার' পেয়েছে।
