‘অসহ্য বিষফোড়া’: চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি থেকে পরিত্রাণ চান ব্যবসায়ীরা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলেছেন, বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তারা ভীষণ উদ্বিগ্ন। চাঁদাবাজি ব্যবসায়ীদের জন্য অসহ্য বিষফোড়া হয়ে দাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে তারা পরিত্রাণ চান।
বুধবার (২১ মে) ডিসিসিআই আয়োজিত "ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে উন্নত আইনশৃখলা পরিস্থিতি বজায় রাখার অত্যাবশ্যকীয়তা" শীর্ষক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারা এসব কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে। ঢাকা জেলার অর্থাৎ প্রধানত ঢাকা শহরের পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এই সংগঠনের সদস্য।
সভায় ধামরাই উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার পরিবর্তনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চাঁদাবাজি বেড়েছে। অসহ্য বিষফোড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ভীষণ উদ্বিগ্ন। নিরাপদ চলাচল ও ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চাঁদাবাজি ব্যবসায়ীদের জন্য বিষফোড়া হয়ে দাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে ব্যবসায়ীরা পরিত্রাণ চায়।
তাসকীন আহমেদ বলেন, গত বছর সরকার পতনের পর আশা করা হয়েছিল আইন-শৃংখলাসহ দেশের সকল ক্ষেত্রে উন্নতি হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় উন্নতির পরিবর্তে অবনতি হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু করেছে। শিল্পায়ন, ডিজিটাল ট্রান্সফর্মেশন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের মতো নীতিগত উদ্যোগ শুরু হয়েছে। কিন্তু এই গতিশীলতার স্বার্থে সবচেয়ে বড় ভিত্তি একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং কার্যকর আইনশৃঙ্খলা পরিবেশ।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, বর্তমানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় অনিরাপদ পরিবেশ, চাঁদাবাজি, প্রতারণামূলক অনলাইন কার্যক্রম, পণ্য পরিবহন ঝুঁকি, জালিয়াতি ও সাইবার হুমকির চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। যা শুধু বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিতই করছে না, বরং স্থায়ীভাবে অনেক উদ্যোক্তার আস্থা হারিয়ে ফেলছে। এ অবস্থায়, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক প্রত্যাশা— তারা যেন নির্বিঘ্নে, স্বচ্ছভাবে ও নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি বলেন, 'গার্মেন্টসে কোনো ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত রেসপন্স করে। কিন্তু এসএমই প্রতিষ্ঠান যারা ৫০ জন বা ১০০ জনের কর্মসংস্থান করেছে, তাদের পাশে তেমন কেউ নেই।'
রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায়— ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ প্রধান অতিথি এবং ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো. নজরুল ইসলামের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু, রাজধানীতে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তারা আসতে পারেননি বলে ডিসিসিআই সভাপতি জানিয়েছেন।
ডিসিসিআই এর সাবেক সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, সরকার পরিবর্তনের প্রত্যাশা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং দিনদিন অবনতি হচ্ছে। আমরা কীভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করব, তা নিয়ে চিন্তিত, ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভ্যাট-ট্যাক্স দিলেও— বর্তমানে আনাকাঙ্ক্ষিত ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে, যা মোটেও কাম্য নয়।
আরেক সাবেক সহ সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আরও অবনতি হলে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে না।
ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মাওলা বলেন, দেশের সকল স্থল বন্দর থেকে ট্রাক ভাড়া করতে হচ্ছে ব্রোকারদের মাধ্যমে। ট্রাক প্রতি ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা দালালদের দিতে হচ্ছে। চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। তিনি সান্ধ্যকালীন বেচাকেনার টাকা নিরাপদে বাসায় নেওয়ার জন্য পুলিশের সহযোগিতা চান।
বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হাশেম বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে ছিনতাইয়ের ভয়ে রাতে ঘর থেকে বের হওয়া যায় না। অন্যান্য ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। হাইওয়ে থেকে চিনির ট্রাক হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে।
মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট সমিতির সভাপতি লুৎফুর রহমান বাবু বলেন, মোহাম্মদপুরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি প্রকাশ্যে চলছে। পুলিশের কাছে সমাধান পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ চায়।
বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নেসার উদ্দিন খান বলেন, কিশোর গ্যাং-এর নৈরাজ্যে এখন জনজীবনের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ছাত্ররা, কম বয়সী ছেলেরা এসে চাঁদা দাবি করে। এর থেকে পরিত্রাণে তিনি পুলিশ প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
বাংলাদেশ মনিহারী বণিক সমিতির সহ-সভাপতি হাজী ফয়েজউদ্দিন বলেন, চকবাজার মৌলভীবাজারে যাতায়াত পরিস্থিতি খুব খারাপ। বিভিন্ন ধরনের গাড়ি অবৈধভাবে সড়ক দখল করে থাকে।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী সৈয়দ মোহাম্মদ বশির উদ্দিন বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এখনও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে না।
সভায় উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ মহায়মেনুল ইসলাম বলেন, ৫ আগস্টের পর বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, তবে আরো উন্নতি করতে হবে। তিনি সম্মতি জ্ঞাপন করেন যে, এখনও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য উপযুক্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি বলেন, কিশোর ও যুবক গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশ বরাবরের মতো কঠোর এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।
সভায় কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, চিনি-তেলের বাজার কিছু কোম্পানি দখল করে রেখেছে। এস আলমের প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পরে সেটি আরও বেড়েছে। বাজার স্বাভাবিক রাখতে আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।
তাসকীন আহমেদ বলেন, আশা করা হয়েছিলো সরকার পরিবর্তনের পর সিন্ডিকেট ভাঙ্গা সম্ভব হবে, কিন্তু হয়নি। চিনির ৫টি কোম্পানি কমে এখন তিনটি হয়েছে। এ অবস্থায় চিনি আমদানি উন্মুক্ত করা উচিত।
এর আগেও বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের আয়োজন করা সভা-সেমিনারে ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন।
কোরবানির ঈদে চাঁদাবাজি প্রতিরোধের উদ্যোগ
বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত 'কোরবানি সম্পর্কিত বিষয়াদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ কমিটি'র সভায়ও চাঁদাবাজি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে চাঁদাবাজি বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভা শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন বলেন, কোরবানির পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চেয়েছি।
'একদলের চাঁদাবাজদের ধরবেন, আবার অন্য দলের চাঁদাবাজদের ছেড়ে দিবেন কি-না' - সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, 'আমি নির্বাক। এবিষয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই।'
তিনি বলেন, 'মূল্যস্ফীতির পেছনে চাঁদার প্রভাব কতোটা, সেটি আমরা পর্যালোচনা করেছি। তাতে বাজার ব্যবস্থাপনায় চাঁদাবাজির তেমন একটা প্রভাব নেই।'
সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কোথায় কোথায় চাঁদাবাজি হচ্ছে– এটা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা আপনাদের দায়িত্ব। আর আমাদের দায় হলো ওইসব জায়গায় চাঁদাবাজি বন্ধ করা। আপনারা সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
কোরবানির পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে সচিবালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করার পাশাপাশি একটি হটলাইন স্থাপন করা হবে বলে জানান বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
তিনি বলেন, সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োজিত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী উপস্থিত ছিলেন। চাঁদাবাজি বন্ধে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ তৎপর থাকবে। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার অংশ হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নিয়ে মাঠে রয়েছে। তারাও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে কাজ করবে।
বাণিজ্য সচিব আরও বলেন, কোরবানির পশু পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধে সচিবালয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সেল ও হটলাইন স্থাপন করা হবে। আমাদের কথা হলো, কেউ যাতে চাঁদা না দেয়। কেউ চাঁদাদাবীর অভিযোগ জানাতে এই হটলাইনে বা ৯৯৯ নম্বরে কল দিলেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিবে। প্রত্যেক বিভাগ ও জেলা পর্যায়েও চাঁদাবাজি বন্ধে হটলাইন স্থাপন করা হবে।
সভায় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা, শিল্প উপদেষ্টা, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী উপদেষ্টা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে গত ১৩ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক সভায় বলা হয়, বাস টার্মিনাল, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা এবং সড়কপথে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পকেটমার, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
মঙ্গলবার ২০ মে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি বৈঠক করেছেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে স্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
