বন্ধকি সম্পত্তির মূল্যায়ন বিরোধে আটকে আছে ৮,৫০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়
খেলাপি ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তির দখল বা নিলামে তোলার পদক্ষেপ নেয় ব্যাংকগুলো। এ পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা ২ হাজার ১৫৪টি রিট পিটিশন হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। ২০২১ সালের শুরু থেকে ঝুলে থাকা এসব মামলায় জড়িত প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালে মে মাসের মধ্যে এরকম ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা ২ হাজার ১৫৪টি রিট পিটিশন হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
আদালতের কর্মকর্তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসোব মামলার সঙ্গে যে পরিমাণ বকেয়া ঋণ জড়িত, তার চেয়ে জামানত থাকা সম্পত্তির বাজারমূল্য প্রায় দ্বিগুণ।
এই আইনি জট বেড়েই চলেছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে নতুন করে ২৩৯টি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আপিল বিভাগে আরও ১৪১টি আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞরা টিবিএসকে বলেন, এ ধরনের বিরোধ ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তর দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। তাদের মতে, জামানত নেওয়ার সময় সম্পত্তির অতিমূল্য দেখানো যেমন বেআইনি, একইভাবে কম মূল্য দেখানোও বেআইনি। এটি ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
এরকম ঘটনা রোধে বাধ্যতামূলকভাবে ফরেনসিক অডিট বা বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে বন্ধকি সম্পদের গুণগতমান ও প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা দরকার বলে উল্লেখ করেন তারা।
পদ্ধতিগত আইনি ফাঁকফোকর
মামলা বৃদ্ধির এই ধারা মূলত অর্থঋণ আদালত আইন বাস্তবায়নের কাঠামোগত দুর্বলতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। বিচারাধীন ২ হাজার ১৫৪ রিটের মধ্যে ১ হাজার ৩৫৯টি রিটেই আদালতে রায় হওয়ার পর জামানতের সম্পত্তির মূল্য খেলাপি ঋণের চেয়ে বেশি হওয়ার পর বাংকের মালিকানা দখলে নেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা হয়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের চেয়ে বেশি মূল্যের জামানতের সম্পত্তি নিলামে ওঠানোর জন্য অর্থঋণ আদালতে দায়ের হওয়া ৭৫৯টি মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়েছে।
ব্যাংকিং আইন বিশেষজ্ঞ ইমরান আহমে ভুঁইয়া বলেন, অর্থ ঋণ আদালত আইন অনুযায়ী কোনো খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা হওয়ার পর জামানতের সম্পত্তি দেখভাল ও প্রকৃত বাজারদর মূল্যায়নের জন্য একজন রিসিভিার নিয়োগ দেবেন আদালত।
'কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংক এরকম রিসিভার নিয়োগের আবেদন করে না। ফলে ব্যাংক যেভাবে দাবি করে মামলা করে, আদালতও সেভাবেই রায় দেয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। এর মানে হলো, ঋণগ্রহীতাকে আইনিভাবে যে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত, তার হিসাব না করেই পুরোনো বাজারদরের ভিত্তিতে সম্পত্তি নিলাম বা বাজেয়াপ্ত করা হয়,' বলেন তিনি।
মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ী শেখ আজহার উদ্দিনের ঘটনাটি এই আইনি ফাঁকফোকরের বাস্তব প্রভাবের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। তার আইনজীবী তাসমিম হোসেন বলেন, আজহার উদ্দিন ২০০৮ সালে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন জাহাজ কেনার জন্য। জামানত হিসেবে ৮ বিঘা জমিসহ একটি কোল্ড স্টোরেজ, মুন্সীগঞ্জ শহরে ৩-তলাবিশিষ্ট ১২ হাজার বর্গফুটের একটি বাণিজ্যিক ভবন ও তিন বিঘা জমিসহ আবাসিক ভবন জামানত রাখেন।
সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করায় ২০১৪ সালে তার ঋণটি খেলাপি হয়ে যায়। খেলাপি ঋণের পরিমান দাঁড়ায় প্রায় ৬৮ কোটি টাকা। ব্যাংক এই ঋণ আদায়ে মামলা করে। ২০১৯ সালে আদালত রায়ে জামানত থাকা সম্পত্তি নিলামে ওঠায়। নিলামে কোনো দরদাতা না পেয়ে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের মাধ্যমে ব্যাংক জামানত থাকা ওই তিনটি সম্পত্তি নিজের দখলে নেয়। সে সময় বাজারদর ১৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও ব্যাংক সম্পত্তির মূল্য ঠিক ঋণের সমপরিমাণ দেখিয়েছিল।
২০২৩ সালের আগস্টে হাইকোর্ট রায় দেম, ব্যাংককে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে জামানত থাকা ওইসব সম্পত্তির প্রকৃত বাজারদর নির্ধারন করতে হবে। এরপর ব্যাংকের পাওনা টাকার চেয়ে সম্পত্তির বাজারদর বেশি হলে, ব্যাংক তার পাওনার অতিরিক্ত টাকা ব্যবসায়ী শেখ আজহার উদ্দিনকে ফেরত দেবে।
কিন্তু ব্যাংক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে। এখন পর্যন্ত সেই আপিল নিষ্পত্তি হয়নি। ব্যাংকের যুক্তি ছিল, সম্পত্তির দখল নেওয়ার সময় ন্যায্য মূল্যই ধরা হয়েছে। পুঞ্জীভূত সুদসহ মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি টাকা।
একই ধরনের একটি মামলা দায়ের করেন চাঁদপুরের কাপড় ব্যবসায়ী মমিনুল হক মিলন। তার খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১.৯৮ কোটি টাকা। বর্তমান বাজারে তার সম্পত্তির দাম ওই দাবির দ্বিগুণেরও বেশি হলেও ২০১২ সালের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অগ্রণী ব্যাংক তার সম্পত্তি দখল করে।
ফরেনসিক অডিটের দাবি
এ ধরনের বিরোধের কারণে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে অর্থঋণ আদালতগুলোতে প্রায় ৭৫ হাজার খেলাপি ঋণ আদায়ের মামলা বিচারাধীন, যার সাথে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা জড়িত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নিয়মিত সম্পত্তির মূল্য পুনর্মূল্যায়ন না করার ফলে ব্যবসায়িক ক্ষতিতে পড়া বৈধ ঋণগ্রহীতারা অন্যায্যভাবে শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এবং বর্তমানে এবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী বলেন, ব্যাংকগুলোয় যে ফরেনসিক অডিট, অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (একিউআর) ও বিশেষ নিরীক্ষা হওয়ার কথা, সেগুলোর আওতায় বন্ধকি সম্পদকেও আনা জরুরি।
তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ থেকে প্রতি বছর যে নিরীক্ষা চালানো হয়, সেটির আওতায় ব্যাংকগুলোর জামানতের সম্পদের গুণগতমান ও মূল্যমান যাচাই করার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাবে ব্যাংকগুলোর জামানতের সম্পত্তির যথাযথ নিরীক্ষা হয়নি।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সবক্ষেত্রে সমানভাবে এই নিয়মগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকগুলোর নিজেদের দায়িত্বেই ঋণের সহায়ক জামানত যাচাই-বাছাই করার কথা।
তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব ঋণের বিপরীতে থাকা বন্ধকি সম্পদ নিরীক্ষা করা খুবই কঠিন। এটি অনেক সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়। এখানে মামলা হওয়ার পর আদালও আইন অনুযায়ী নিরীক্ষার উদ্যোগ নিতে পারে।
