টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি
জুনে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এরমধ্যে টানা তিন মাস ধরে মূল্যচাপ উচ্চ পর্যায়েই আছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সোমবার (৬ জুলাই) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনে জাতীয় পর্যায়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
এর আগে মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং এপ্রিলে ছিল ৯ দশমিক ০২ শতাংশ।
গত বছরের জুনে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হলেও তা অর্জিত হয়নি।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসের চলতি গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত একই সময়ে ছিল ১০ দশমিক ০৩ শতাংশ।
বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুনে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি কমেছে। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি মে মাসের ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে।
২০২৫ সালের জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা গত এক বছরে বেড়ে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ হয়েছে।
জুনে মূল্যস্ফীতি কমার ব্যাখ্যায় ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, জুনে মূল্যস্ফীতির সামান্য হ্রাসকে মূলত মৌসুমি প্রভাব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
তিনি বলেন, "বছরের এই সময়ে সাধারণত সরবরাহ কিছুটা বাড়ে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে। ফলে বাজারের চাপ কিছুটা কমে এবং মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে নিচের দিকে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের অস্থিরতাও কিছুটা কমেছে, যা এই মৌসুমি প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে।"
তবে এটিকে স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি।
ড. মুজেরি বলেন, "চলতি অর্থবছরের অধিকাংশ সময়জুড়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই ছিল এবং তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। বরং সামগ্রিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা অব্যাহত ছিল, যা সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার দিকটি স্পষ্ট করে।"
তিনি বলেন, "মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক বলা যায় না। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও চাপে রয়েছে।"
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি উল্লেখ করে ড. মুজেরি বলেন, শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করলে হবে না। নীতিসুদ হার ১০ শতাংশে বজায় থাকলেও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, রাজস্বনীতি ও বাজার তদারকি সমন্বিতভাবে জোরদার করতে হবে।
তিনি বলেন, "মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সমন্বিত ও শক্তিশালী নীতি প্রয়োগ অপরিহার্য।"
জ্বালানি তেলের মূল্যও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "জ্বালানি খাত কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এর প্রভাব পুরোপুরি এখনও প্রতিফলিত হয়নি। সাধারণত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতিতে কিছুটা সময় নিয়ে প্রকাশ পায়। তাই আগামী মাসগুলোতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, মূল্যস্ফীতি সাধারণত চাহিদা-নির্ভর ও উৎপাদন খরচ-নির্ভর—দুই ধরনের কারণে প্রভাবিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা যায়।
তিনি বলেন, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের সংকট এবং এর ফলে অন্যান্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করেছে।
ড. বিদিশা বলেন, "জুনে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে—এ তথ্যকে খুব বড় বা তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও একে স্থায়ী প্রবণতা বলা যায় না।"
তিনি বলেন, "আগামী এক থেকে দুই মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে, এটি সাময়িক ওঠানামা, নাকি ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতার সূচনা। যদি ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি কমতে থাকে, তবে সেটি অবশ্যই স্বস্তিদায়ক হবে।"
গ্রামে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.২৩ শতাংশ
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুনে গ্রামীণ পর্যায়ে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫২ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি জুনে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা মে মাসেও একই ছিল।
শহরে মূল্যস্ফীতি কমে ৯.০১ শতাংশ
বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে শহরাঞ্চলে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনে শহরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ।
মজুরি হার এখনও মূল্যস্ফীতির নিচে
দেশে জুনে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মজুরি হার পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, টানা ৫২ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।
