নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য চট্টগ্রামবাসীর ওয়াদা নিলেন প্রধানমন্ত্রী
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'আগামী নির্বাচনে আমি আপনাদের কাছে ওয়াদা চাই, আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। আওয়ামী লীগকে আপনাদের সেবা করার সুয়োগ দেবেন কি না ওয়াদা চাই। আপনারা হাত তুলে ওয়াদা করেন—নৌকায় ভোট দেবেন।'
এ সময় সমাবেশে উপস্থিত জনতা দুই হাত তুলে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার ওয়াদা করেন। এভাবেই রোববার চট্টগ্রামে রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠে আওয়ামী লীগের সমাবেশে উপস্থিত জনতার কাছ থেকে নৌকায় ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করেন শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দেশে গণতান্ত্রিক ধারা আছে বলেই তো দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে। দীর্ঘদিন গণতন্ত্র আছে বলেই দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। অথচ বিএনপি গণতান্ত্রিক ধারায় তা পছন্দ করে না। জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে, সংবিধান লঙ্ঘন করে, সেনা আইন লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তাদের ধারণা, তারা আবারও ওভাবেই ক্ষমতায় আসবে।'
শেখ হাসিনা আরও বলেন, 'এই বিজয়ের মাসে আমি আপনাদের জন্য উপহার নিয়ে এসেছি। আজ ২৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ৬টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। এর আগে গত ১৯ বছরে চট্টগ্রামে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে।'
বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে মজবুত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সারা বিশ্বে বিদ্যুতের অভাব, জ্বালানির অভাব। সে অবস্থায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে মজবুত। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের দেশের মানুষ যেন কষ্টে না থাকে। কিছুদিন বিদ্যুতের জন্য কষ্ট পেয়েছেন, এখন সে সমস্যা আর নেই। কিন্তু আপনাদের একটা অনুরোধ, আপনাদের সাশ্রয়ী হতে হবে।'
১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকায় সমাবেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেছিল। এর আগে ১০ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্য শুরু করেছিলো। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ১০ ডিসেম্বর তাদের অনেক প্রিয়। বোধহয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ওদের দোসর ছিল বলেই ওই ১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকা দখল করতে চায়; আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার কথা বলছে।'
১৯৯৬ সালে বিএনপির নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, 'খালেদা জিয়া ১৫ ফ্রেব্রুয়ারি জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতায় বসেছিলেন। আর ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলেই তাকে বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয় নাই। সারা বাংলাদেশ ফুঁসে উঠেছিল, খালেদা জিয় দেড় মাসের কম সময়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেকথা বিএনপির মনে রাখা উচিত। নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বিএনপি চায় অন্য কোনো পক্ষ সরকার উৎখাত করে পালকি-দোলনায় চড়িয়ে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা উন্নয়ন করেছি, আর বিএনপি মানুষ খুন করে, মিথ্যে কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তারা গ্রেনেড মারতে পারে, বোমা মারতে পারে। তারা সারা দেশের ৬৩টা জেলায় বোমা হামলা করেছে। তারা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে বাংলাদেশের মানুষকে শান্তিতে থাকতে দেয় নাই।
'ক্ষমতায় গিয়ে তারা লুটপাট করেছে দুই হাতে। জনগণের অর্থ পাচার করেছে। নিজেরা অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে।'
ওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, 'বিএনপি দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, ২০১৩ সালে ট্রাকে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল। ৩ হাজার মানুষ অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল, ৫০০ মানুষ মারা গিয়েছিল, পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সাড়ে ৩ হাজার গাড়ি। যাদের মধ্যে মনুষত্ব আছে তারা কি এভাবে মানুষ মারতে পারে?'
১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে হামলার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে জনসভা করতে গিয়েছিলাম। সেই সভায় নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল তখনকার এরশাদ সরকার। সেই গুলি চালানোর দায়িত্বে ছিল পুলিশ অফিসার রকিবুল হুদু। আমি অবাক হয়ে যাই খালেদা জিয়া এই পুলিশ অফিসারকে প্রমোশন দিয়ে পুলিশের প্রধান করেছিলেন।'
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত জনতার উদ্দেশে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, 'আসসালামু আলাইকুম! অনেরা ক্যান আছন? বেয়াজ্ঞুন গম আছননি? তোয়ারার লাই আঁরতে পেট পুরের। ইতেল্লাই আই আইসিদি।' (অর্থাৎ আসসালামু আলাইকুম। আপনারা কেমন আছেন? সবাই ভালো আছেন?'
এ সময় জনসভাস্থল থেকে সমস্বরে নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীকে 'গম আছি বলে' জবাব দেন এবং প্রধানমন্ত্রী কেমন আছেন জানতে চান।
ব্যাংক নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে বিএনপি-জামায়াত
দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট গুজব ছড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, 'দেশে এখনো ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ আছে। আমি ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। আর এই ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়াচ্ছে বিএনপি-জামায়াত।
'তারা বলছে, ব্যাংকে টাকা নেই। গুজব শুনে মানুষ ব্যাংকে গেছে, টাকা তুলে এনেছে। এরপর তা ঘরে, বালিশের নিচে গুঁজে, তোশকের নিচে বা আলমারিতে রেখেছে। অনেকের টাকা চোরে নিয়ে গেছে। অনেকের সর্বনাশ হয়েছে। মানুষের সর্বনাশ করা বিএনপি-জামায়াতের কাজ। নাকি চোরের সঙ্গে তাদের সখ্যতা রয়েছে, তা নিয়ে আমরা প্রশ্ন।'
রিজার্ভের টাকায় টিকা কিনেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময় দেশের রিজার্ভ ছিল ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আমরা তা ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উন্নীত করেছি। এই রিজার্ভ ব্যবহার করে আমরা করোনার ভ্যাকসিন কিনেছি।
'পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ পর্যন্ত জনগণকে ভ্যাকসিন দিতে পারেনি। আমরা বিনে পয়সায় ভ্যাকসিন দিয়েছি। মহামরির সময় মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছি। ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রণোদনা, শ্রমিকদের বেতন, কৃষকদের টাকা দিয়েছি। ওষুধ কিনেছি। ভ্যাকসিন কিনতে স্পেশাল প্লেনও পাঠিয়েছিলাম। এখনও করোনার ভ্যাকসিন বিনে পয়সায় দিচ্ছি। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইউরোপ কেউ পারেনি।'
শেখ হাসিনা বলেন বলেন, 'আমরা ৩৫ লাখ মানুষকে বিনে পয়সার ঘর দিয়েছি। জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। দেশে খাদ্যের সংকট নেই। আমরা ক্ষমতায় আসার পর দেশের খাদ্য উৎপাদন করেকগুণ বাড়িয়েছি।'
বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'খালেদা জিয়া এতিমের টাকা আত্মসাতের জন্য জেল খাটছেন। তারা শুধু ভোট চুরি, লুটপাট, দুর্নীতি, মানুষ খুন ছাড়া কিছু পারে না। তারা নির্বাচনে যেতে চায় না। এজন্য তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে যায়নি।'
সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির আট সমাবেশের চেয়ে বেশি লোক হয়েছে আজকে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডের সভায়। জনসমুদ্র তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, 'ফখরুল, দেখে যান। আমির খসরু, নোমান সাহেব, দেখে যান।'
ওবায়দুল কাদের বলেন, 'সারা চট্টগ্রামজুড়ে মিছিল আর মিছিল। ফখরুল, খেলা হবে, হবে খেলা। বীর চট্টগ্রাম প্রস্তুত।'
চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর জেলা, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে দলটির নগর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহাতাব উদ্দিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রীসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এর আগে সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে ৮৩তম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদি কোর্সের কমিশন উপলক্ষে আয়োজিত 'রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ-২০২২'-এ যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
