বৈদ্যুতিক যানে যুগান্তকারী বিপ্লব আনছে এবিবির চার্জার, ফুলচার্জ হবে ১৫ মিনিটেরও কম সময়ে
জলবায়ু পরিবর্তন আজ এমন এক বাস্তবতা যা অস্বীকার করার নেই কোনো উপায়। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধে সাধারণ ভোক্তাদের সচেতনতাও বাড়ছে। তেল-গ্যাস ইত্যাদির শক্তিচালিত যানবাহন গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম বড় উৎস। তাই বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতন মানুষের কাছে বাড়ছে বৈদ্যুতিক যানের আবেদন।
সামর্থ্যবানেরা একটু বাড়তি মূল্য দিয়ে হলেও কিনতে চান বৈদ্যুতিক গাড়ি। তবে অনেকে আগ্রহ দেখিয়েও শেষপর্যন্ত নিরস্ত হচ্ছেন চার্জিং- এর বিপত্তির কথা ভেবে।
এমনই এক ব্যক্তি জনপ্রিয় মডেলের একটি গাড়ির বৈদ্যুতিক সংস্করণ কিনতে চেয়ে শেষমেষ কিনে ফেলেন প্রচলিত জ্বালানির গাড়ি। প্রশ্ন জাগতেই পারে, পরিবেশগত সুবিধা জেনেও এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলেন তিনি? কারণ ওই একটাই, চার্জিং নিয়ে উদ্বেগ। ভোক্তা শুধুমাত্র পরিবেশ সচেতন হন না, তারা সুবিধার কথাই আগে ভাবেন। তার ক্ষেত্রেও হয়নি ব্যতিক্রম।
তিনি জানান, দূর যাত্রায় হাইওয়েতে বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গেলে কী হবে- ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ি। আর যদি চার্জিং স্টেশন পেয়েও যাই, সেক্ষেত্রে ফুল চার্জ করাতে দুই ঘণ্টা! বসে অপেক্ষা করতে হতে পারে। এসব ভাবনা আমাকে শেষমেষ সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে।
এমন সম্ভাব্য ক্রেতা আছেন অগণিত, যারা চার্জিং সুবিধার বর্তমান হাল নিয়ে সন্তুষ্ট নন। ইচ্ছে থাকলেও বাস্তব সুবিধার কথা ভেবে তারা প্রচলিত জ্বালানির গাড়িই কিনছেন।
অথচ একবিংশ শতকের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ধারা বলা হচ্ছে বাহনের বিদ্যুতায়নকে। তবে সে লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রথম ও প্রধান বাঁধাই হচ্ছে –গাড়ির রেঞ্জ বা পাল্লা ঘিরে উদ্বেগ। ইভির ক্ষেত্রে একবার চার্জে যতদূর পথ পাড়ি দিতে পারে সেটাই তার রেঞ্জ।
কিন্তু, চালকেরা যদি ডিজেল বা পেট্রোলের মতো কয়েক মিনিটের মধ্যেই চার্জও করাতে পারেন, তাহলে ক্রেতাদের প্রাথমিক উদ্বেগটাই দূর হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চার্জিং স্টেশনগুলোয় গিয়ে ইভি চালকেরা ব্যস্ত ফুয়েল স্টেশনের মতো দীর্ঘ অপেক্ষার সম্মুখীন হন। সামনের গাড়ি চার্জ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সাড়বেঁধে অপেক্ষা করতে হয়।
ভোক্তাদের উদ্বেগ দূর করতে গাড়ি প্রস্তুতকারকরা এমন ইভি তৈরি করছেন যা একবার চার্জ করালে আরও দূরের পথ পাড়ি দিতে পারে। চার্জিং- এর সময় কিন্তু সে তুলনায় কমছে না। দূরপাল্লার ইভির ব্যাটারির শক্তিধারণ ক্ষমতা যেমন বেশি, তেমনি চার্জ করাতেও লাগে বেশি সময়। বেশিরভাগ পাবলিক চার্জিং স্টেশনে চার্জ পূরণও সময়সাপেক্ষ। ফলে কয়েক মিনিট নয়, অপেক্ষার পালা হয় ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ।
আরেকটি বড় ঘটনাও এখানে প্রভাব ফেলছে। ইভির বেশিরভাগ ক্রেতাই আগে প্রচলিত জ্বালানির গাড়ি ব্যবহার করেছেন। এসব যানে প্রয়োজন মাফিক তেল ভরাতে লাগতো কমবেশি মিনিট পাঁচেক। অথচ অত্যন্ত ভালো মানের চার্জার দিয়ে ইভি ব্যাটারিকে দূরপাল্লার উপযোগী বিদ্যুৎ দিতে বা ৮০ শতাংশ চার্জ করাতে সময় লাগে ন্যূনতম এক ঘণ্টা। তাও যদি ভাগ্যক্রমে চার্জিং স্টেশনে অন্য গাড়ির ভিড়ে অপেক্ষা না করতে হয়।
অটোমোবাইল শিল্পের বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, "দীর্ঘসময় অপেক্ষা সম্ভাব্য ইভি ক্রেতাদের বিমুখ করছে; ফলে তারা জীবাশ্ম জ্বালানির গাড়িই কিনছেন।"
সমস্যাটি সমাধানে চার্জিং সময় কমিয়ে পেট্রোলিয়াম ভরানোর মতো সংক্ষিপ্ত করতে চাইছে ইভি উৎপাদক অটোমোবাইল শিল্প। তাদের আশা, এতে প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়বে ইভির।
একারণেই শুধু গাড়ি ও ব্যাটারি নয়- বরং চার্জিং প্রকৌশলের সমানতালে উন্নতিও পাচ্ছে প্রাধান্য। এই প্রযুক্তিতে আশাবাদ দেখিয়েছে এবিএবি কোম্পানির টেরা ৩৬০ চার্জার, যা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বলে দাবি কোম্পানিটির।
টেরা ৩৬০ চার্জার কতোটা যুগান্তকারী:
সম্প্রতি বাজারে আসা এই চার্জারটি সব ধরনের ইভি চার্জ করতে পারে। এবিবির দাবি, বাজারে থাকা অন্য পণ্যের চেয়ে দ্রুততম সময়ে চার্জের অভিজ্ঞতা দেবে এটি গ্রাহকদের।
'টেরা ৩৬০' একটি মডিউলার চার্জার যা বিদ্যুৎশক্তি বন্টনের মাধ্যমে একসাথে চারটি ইভি চার্জ করতে পারবে। সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎপ্রবাহে যেকোনো বৈদ্যুতিক কার ফুলচার্জ হবে ১৫ মিনিটেরও কম সময়ে।
এই চার্জার যুগান্তকারী প্রমাণিত হতে পারে। কারণ এপর্যন্ত বাজারে সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারচার্জার ছিল টেসলার, যা ৩০মিনিটে ৮০ শতাংশ চার্জ করতে পারে।
এবিবির ই-মোবিলিটি বিভাগের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্ক মুয়েহলন বলেছেন, "বিশ্বব্যাপী সব সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ইভি সহায়ক নীতি প্রণয়নে ঝুঁকছে, দিচ্ছে চার্জিং নেটওয়ার্ক স্থাপনে গুরুত্ব। এজন্য ইভি চার্জের অবকাঠামো; বিশেষত দ্রুততম সময়ে চার্জ পরিষেবা দেবে এবং পরিচালনা করাও সহজ- এমন চার্জিং স্টেশনের গুরুত্ব বাড়ছে। টেরা ৩৬০ চার্জারে অনেক ধরনের অপশন থাকায়- এটি সে চাহিদা পূরণের অন্যতম সহায়ক হবে বলে আমরা আশা করছি, যা বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক যোগাযোগের প্রসার ঘটাবে।"
তাছাড়া, চার্জারের সুবিধাজনক আকার থাকায় এটি কেবল প্রচলিত ফুয়েল স্টেশন নয়, স্থাপন করা যাবে মহাসড়কের পাশের দোকান বা পার্কিং লটেও।
এবিবি একসাথে বেশ কয়েকটি দেশে বাজারজাত শুরু করবে টেরা ৩৬০। বিশ্ববাজারে চার্জিং সমাধানের জন্য বিখ্যাত কোম্পানিটি বর্তমানে ৮০টির বেশি দেশে ১৪ হাজার ডিসি সক্ষমতার ফাস্ট চার্জার স্থাপন করেছে।
- সূত্র: লাইভমিন্ট
