এই দুনিয়া যদি ভার্চ্যুয়াল হতো
[ফিলিস্তিনি কবি গায়াথ আলমাধুনের জন্ম সিরিয়ার দামেস্কের এক ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে, ১৯৭৯ সালে। ২০০৮ সালে পাড়ি জমান সুইডেনে। কয়েক বছর ছিলেন স্টকহোমে, এখন বার্লিনপ্রবাসী। তিনি কবিতা লেখেন মাতৃভাষা আরবিতে; তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি, সুইডিশ, জার্মান, ফরাসিসহ এক ডজনের বেশি ভাষায়। এই কবিতাটি তিনি পাঠ করেছেন গত শরতে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া সিটিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে। বাংলাদেশের লেখক হিসেবে মশিউল আলম সেখানে উপস্থিত ছিলেন।]
যদিও জানালাটা ভার্চ্যুয়াল, মৃতেরা কিন্তু বাস্তব।
খালেদ সোলাইমান আল নাসিরি
১. যুদ্ধ শেষ
যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে বোমা পড়ছে।
এই দুনিয়া যদি ভার্চ্যুয়াল হতো
আমি ইলেকট্রনিক সংবাদপত্র দিয়ে সাফ করতাম ওই জানালা
যা দিয়ে তোমাদের বাড়ি দেখা যায়
আর আমি আমার ভাইয়ের কবরে যে প্লাস্টিকের গোলাপ রেখে এসেছিলাম
সেটা প্রাণ পেয়ে জেগে উঠত।
যুদ্ধ শেষ, যে বন্ধুরা তাজা মৃত্যু কেনার জন্য বাজারে গিয়েছিল, তারা পথিমধ্যে নিহত হয়েছে।
এই দুনিয়া যদি ভার্চ্যুয়াল হতো
আমি আমার বন্ধুদের রিসাইকেল করে নিয়ে আসতাম;
আমার সেকেন্ডহ্যান্ড বন্ধু প্রয়োজন।
যুদ্ধ শেষ হয়েছে, মৃতেরা সহিসালামতে ফিরে গেছে নিজ নিজ পরিবারের কাছে, শহীদেরা ফিরেছে মায়েদের কাছে, মায়েরা বাড়ি ফিরে গেছে; ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, অলিগলি, মসজিদ, চোখ ও পায়েরা ফিরে গেছে নিজ নিজ মালিকের কাছে; স্কুলেরা ফিরেছে শিশুদের কাছে, কাপড় শুকানোর তার ফিরেছে ব্যালকনিতে, প্রেমিকেরা ফিরেছে ছাদে; আমার ভাই ফিরেছে আমার মায়ের কাছে,
আর আমি ফিরে গেছি দামেস্কে।
এই দুনিয়া যদি ভার্চ্যুয়াল হতো
আমি যুদ্ধ স্মরণ করতে ভুলে যেতাম
ভুলে যাওয়ার কথা মনে পড়ত আমার, যেভাবে মৃতেরা ভুলে যায়
সেনাপতির চেহারা আর
শহীদদের মনে পড়ে যায় বাড়ির পথ।
যুদ্ধ শেষ; আমি যাদের চিনতাম তারা হয় মৃত, নয় যুদ্ধাপরাধী, নয়তো মৃত যুদ্ধাপরাধী।
এই দুনিয়া যদি ভার্চ্যুয়াল হতো
আমি যুদ্ধ বন্ধ করে দিতাম, যেভাবে তোমরা বন্ধ করো টেলিভিশন
কিন্তু আমরা জন্মেছি এক কুত্তার বাচ্চা দুনিয়ায়
আর কুত্তার বাচ্চা দুনিয়ায় মানুষ জন্ম নিলে
সময় বদলে গিয়ে হয় টাইপরাইটার
আর মৃতেরা পরিণত হয় কবিতায়।
কমেডি ফুটনোট:
দান্তের প্রতিভা ত্রিশঙ্কু দশার বর্ণনায়; একটু ভেবে দেখুন, বুঝতে পারবেন যে আমরা বাস করছি দোজখের প্রথম বলয়ে।
(কাট)
২. যুদ্ধ
আমি তোমার জন্য সেমিটিক ভাষা থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় যুদ্ধ অনুবাদ করার চেষ্টা করছিলাম আর তুমি বিদ্ধ হলে গোলার টুকরায়। আমি তোমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়াতে গিয়েছিলাম আর নিউজ বুলেটিনগুলো আমাদের পাকড়াও করে ফেলল। নিরাপত্তা পরিষদ চেষ্টা করেছিল আমাদের অত্যাধুনিক অস্ত্র পাঠাতে আর মাথামোটা নিরাপত্তা প্রহরীরা সেগুলো জব্দ করেছিল; আমরা রেডক্রসকে বকা দিয়েছিলাম আর ভ্যাটিক্যান তাতে আপত্তি জানিয়েছিল, যেসব কুকুরের মালিকেরা নিহত হয়েছে, আমরা সেগুলোর মাংস খেয়েছিলাম কিন্তু পরিবেশবাদীরা আপত্তি জানিয়েছিল; আমরা ডুবে মরা থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম, ইউরোপের ডানপন্থীরা তাতে আপত্তি করেছিল।
তোমাকে পোস্ট ট্রমাটিক ট্রেস ডিজঅর্ডারে না ফেলে আমি কী করে দেখাব, ডিটেনশন সেন্টারের গ্যাস চেম্বারের পুরু প্রাচীরের গায়ে হাড়-জিরজিরে হাতের থাবড়ানির সঙ্গে কত মিল এই পৃথিবীর? সিরিয়া ও সুরিয়ালিজম নিয়ে গোলকধাঁধায় না ফেলে তোমাকে কী করে বোঝাব আমি ঘরের দাস আর মাঠের দাসের মধ্যে কী তফাৎ?
একই কবিতায় আমি কী করে বলব আমার বন্ধুদের অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলা হয়েছে এবং তুমি নিউইয়র্কের চেয়েও সুন্দর? বললে কি লোরকা তার কবরের মধ্যে অট্টহাসি হেসে উঠবে না? কবিতা কি আলাদা হয়ে যাবে না বাস্তব থেকে?
ট্র্যাজেডি ফুটনোট:
এই দুনিয়ার সমস্যা এটা নয় যে এর দুই-তৃতীয়াংশ বাসিন্দা মানসিক চিকিৎসালয়ে যায়, সমস্যাটা হলো এই যে বাকিরা যায় না।
(কাট)
তিন. দাবা
বাতাস বয়ে গেল, দেখতে পেল না যে গাছ ও কুঠার চেয়ে আছে আমার দিকে, আর আমি যুদ্ধবিরতির মতো শান্ত, ছায়াপথের এক প্রত্যন্ত শহরতলির এক নীল গ্রহে আটকা পড়ে বুঁদ হয়ে আছি অনুবাদের কাজে। দেখি একটা হরিণ গিলে খাচ্ছে এক নেকড়েকে; টপটপ করে রক্ত ঝরছে তার দাঁত থেকে, দেখি অনূঢ়া মেয়েরা বুকের দুধ দিচ্ছে মৃতজন্ম ভ্রƒণদের; দেখি ইলেকট্রনিক মাছিরা টুইটার থেকে বেরিয়ে এসে চক্কর খাচ্ছে আমার বন্ধুদের লাশের ওপর; দেখি মাছধরা নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে একটা দেশ আর এক লোক তার মৃত ভাইয়ের মাংস খাচ্ছে, কোরানে যেমন বলা হয়েছে তেমন রূপকভাবে নয়, বোমা হামলায় নিহত ভাইয়ের মাংস খাওয়া, যাতে অনাহারে মরতে না হয়।
বাতাস বয়ে গেল কিন্তু গাছ, নগরী কিংবা দেশকে দেখল না। কুকুরেরা ডাকল না, কাফেলা এগিয়ে গেল না। আমার বিধবা বউ চেয়ে রইল আমার দিকে আর যুদ্ধ কি পরিষ্কার! ঠিক যেন দাবা খেলা। তেলের ব্যারেল দামে বাড়ছে আর শহরে পড়ছে টিএনটিভরা ব্যারেল বোমার ঝাঁক; উড়োজাহাজগুলো স্কুলের পাঠ্যবই চাটছে আর শিশুদের আঙুল চুষছে আর আমি চুপচাপ ইউরোপীয় নাগরিকের মতো, যে প্রথম বিশে^র সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এবং পোষা নেকড়ের সারল্য নিয়ে জিজ্ঞেস করে: সুইডিশ শীতকাল আর আরব বসন্তের মধ্যে কোনটা বেশি কর্কশ?
অ্যাবসার্ড ফুটনোট:
নিউইয়র্ক টাইমস বলে দুধ সাদা, পল সেলান বলে দুধ কালো, আমার মা বলে কোনো দুধ নাই!
(কাট)
চার. ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার একটি রূপক
দান্তে ঠিক ছিল। আমরা যে কমেডি যাপন করছি, তা ঐশ^রিক বা ন্যায্য কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে এর অন্তত সাতানব্বই ভাগ ঐশ^রিক, তা না হলে তুমি এর কী ব্যাখ্যা দেবে যে আমাদের চারপাশের সবকিছুরই একটা করে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ার রূপক আছে!
ফুলেরা মৌমাছির মাধ্যমে সঙ্গম করে!
অ্যাডলফ হিটলার ছিল নিরামিষভোজী!
আমরা খুশি যে আমেরিকা অ্যাটম বোমাটা টোকিওতে মারেনি!
স্বৈরশাসকের সমর্থকেরা মিছিল করে মিছিল-মিটিং বাতিল করার দাবিতে!
আমি তোমাকে ভালোবাসি!
দুধ-মধুর নহর-বওয়া ভূমির ব্যবসা করে ঈশ^র!
ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট অনুসারে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড!
তুমি গলায় যে ক্রুশ পরো, সেটা নির্যাতনের একটা রোমান হাতিয়ারের বেশি কিছু নয়!
ট্র্যাজিকমেডি ফুটনোট:
যেহেতু অবশেষে একদিন সকলেই মারা যাবে, তাই সিরিয়া আর সুইডেনে মৃত্যুহার একই।
(কাট)
(ক্যাথরিন কোবহ্যামের অনূদিত ইংরেজি ভাষ্যের অনুসরণে)
