২০২৩ সাল নাগাদ পোশাক খাতে ২৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন উদ্যোক্তারা

অর্থনীতি

06 October, 2021, 01:10 am
Last modified: 06 October, 2021, 01:47 pm
শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পোশাক খাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে আরও ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে ২০২৩ সাল নাগাদ দেশের পোশাক কারখানার মালিকরা পোশাক খাতে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবেন।

এই বিনিয়োগ তারা করছেন মূলত নতুন প্রযুক্তি আমদানির জন্য। এসব প্রযুক্তি আনা হচ্ছে দেশের পোশাক খাতের ক্রমবর্ধমান রপ্তানি চাহিদা মেটাতে। 

এছাড়াও আশা করা হচ্ছে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫টি ইউনিটে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন গতকাল সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য জানান।

এই বিনিয়োগ আসবে নতুন ১৩টি টেক্সটাইল ইউনিট স্থাপনের মাধ্যমে। বাকি ১২টি ইউনিট আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মূলত এই ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্যই নতুন ইউনিট স্থাপন ও পুরনো ইউনিটের উৎপাদনব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে।

নতুন স্থাপন করা ইউনিটের সক্ষমতা হবে প্রায় ২৫ লাখ মিলিয়ন স্পিন্ডল। বর্তমানে এই শিল্পের সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ স্পিন্ডল।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পোশাক খাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে আরও ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

পোশাক খাত মিশ্র সুতা ও পলিয়েস্টার, সিনথেটিক, ভিসকোস এবং লাইক্রার (কৃত্রিম ফাইবার হিসেবে পরিচিত) মতো ফ্যাব্রিক উৎপাদনে পিছিয়ে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে নতুন এই বিনিয়োগের ফলে পোশাক খাত এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে।

বিটিএমএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, নতুন ইউনিটগুলো ইতিমধ্যেই মূল যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য লেটার অভ ক্রেডিট দিয়েছে। সবগুলো ইউনিটই ২০২৩ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসবে।

বিটিএমএ সভাপতি জানান, চীনের সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের তাঁত শিল্প বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। 

তিনি বলেন, এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য প্রায় ২৫ লাখ বেল কাঁচা তুলা আমদানি করতে হবে। ২০২০-২১ সালে বাংলাদেশ ৮২ লাখ বেল কাঁচা তুলা আমদানি করেছে। 

ব্যাপক টিকাদানের সুবাদে বাংলাদেশের পোশাকের দুই প্রধান গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকায় মহামারির প্রকোপ কমে গেছে। এর ফলে এ দুই অঞ্চলে তৈরি পোশাকের চাহিদা কোভিডপূর্ব সময়ের পর্যায়ে ফিরে আসছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানিয়েছে, অনেক পোশাক প্রস্তুতকারকই এখন বাড়তি কার্যাদেশ পাচ্ছেন। বর্তমান সক্ষমতা ব্যবহার করে এসব অর্ডারের কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা যাবে না।

এছাড়াও আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যযুদ্ধের কারণেও স্থানীয় উদ্যোক্তারা কিছু ভ্যালু-অ্যাডেড সুতা ও ফ্যাব্রিকে বিনিয়োগ করতে উৎসাহী হয়েছেন।

নতুন এই বিনিয়োগ আসবে মডার্ন সিনটেক্স, আবুল কালাম স্পিনিং মিলস, ইউনিভার্সাল ডেনিম, করিম টেক্স, নাইস স্পিনিং, মন্ডল স্পিনিং, চন্দ্রসি স্পিনিং, এনআর স্পিনিং, ওয়াজিদ স্পিনিং মিলস, র টেক, বেক্সিমকো গ্রুপ, আরবিডি ফাইবারস এবং সুফিয়া কটন টেক্সটাইল থেকে।

করিম টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওয়াহিদ মিয়া জানান, ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে করিম গ্রুপ দৈনিক ১১২ টন সুতা উৎপাদনের জন্য ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে ৮০ টন হবে প্রাকৃতিক সুতা এবং ৩২ টন সিনথেটিক সুতা।

তিনি আরও বলেন, নতুন ইউনিটটি হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় স্পিনিং মিল। ইউনিটটির ২০২৩ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনের যাওয়ার কথা রয়েছে।

ওয়াহিদ বলেন, এই ইউনিটে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

এদিকে পোশাক খাতে নতুন আসা চাঁদশ্রী লিমিটেড বছরে প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ টন সুতা উৎপাদনের জন্য ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবিএম জাফর আহমেদ।

অন্যদিকে এশিয়া কম্পোজিট, ম্যাকসনস গ্রুপ, এনভয় গ্রুপ, নিউ এশিয়া গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, প্রাইড গ্রুপ, সাশা গ্রুপও সক্ষমতা বাড়াতে বিনিয়োগ করছে।

এর মধ্যে বিদ্যমান ৭০ হাজার স্পিন্ডলের সঙ্গে আরও ৪৮ হাজার স্পিন্ডল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে এশিয়া কম্পোজিটের।

এনভয় গ্রুপও সিনথেটিক মিশ্র সুতা উৎপাদনের জন্য ১২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। প্রতিষ্ঠানটির নতুন ইউনিটে দিনে ১২ টন সুতা উৎপাদিত হবে।

এনভয় গ্রুপের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দীন আহমেদ বলেন, 'রপ্তানিকৃত সুতার বিকল্প হিসেবে কটন ও সিনথেটিকের মিশ্র "এক্সপেন্ডেড সুতা" উৎপাদনের জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছি।'

বিটিএমএর তথ্যানুসারে, ২০২০ সালে বাংলাদেশে ৪৩৩টির বেশি স্পিনিং মিল চালু ছিল। এই মিলগুলো সম্মিলিতভাবে বছরে ৩২৭ কোটি কেজি সুতা উৎপাদনে সক্ষম।

স্থানীয় স্পিনাররা নিটওয়্যারের জন্য যে পরিমাণ সুতা ও ফ্যাব্রিকের প্রয়োজন হয়, তার ৮৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম।

ওভেন কাপড়ের ক্ষেত্রে, স্থানীয় তাঁতিরা প্রয়োজনের ৪০ শতাংশেরও কম সুতা ও ফ্যাব্রিক সরবরাহ করতে পারেন। এ কারণে ওভেন পোশাক শিল্প বিদেশি ফ্যাব্রিকের ওপর নির্ভরশীল রয়ে গেছে। 

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পোশাক প্রস্তুতকারকদের প্ল্যাটফর্ম ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার ফেডারেশনের (আইটিএমএফ) তথ্যানুসারে, বৈশ্বিক ফ্যাশন ও কাপড়ের বাজারের প্রায় ৭৮ শতাংশই কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পোশাকের দখলে রয়েছে। বাকি ২২ শতাংশ আছে কটনের তৈরি বিভিন্ন কাপড়ের দখলে।

বিদ্যমান ৭০ হাজার স্পিন্ডলের সঙ্গে আরও ৪৮ হাজার স্পিন্ডল স্থাপনের পরিকল্পনা করছে এশিয়া কম্পোজিট।

Comments

While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.