চীন কি ইরানকে শান্তি চুক্তিতে রাজি করাতে পারে? শুধু যদি বিনিময়ে বড় কিছু পায়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন বেইজিং সফরের ঠিক এক সপ্তাহ আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে চীন কি শান্তি দূত বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারে?
একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি এবং দফায় দফায় ব্যর্থ কূটনীতির পর যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া এই যুদ্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না, তখন তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই এখন সম্মানজনকভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর পথ খুঁজছে।
আর কাগজ-কলমে এই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বেইজিংই এখন সবচেয়ে যুতসই দাবিদার।
দীর্ঘদিন ধরেই চীন ইরানের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মিত্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উভয় দেশের বৈরিতা এবং চীনের সস্তায় তেলের চাহিদাই এই বন্ধুত্বের ভিত্তি। আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গেও বেইজিংয়ের সরাসরি যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে; আগামী সপ্তাহে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাবেন চীনা নেতা।
সম্ভবত এই মোক্ষম সময়টিকেই বেছে নিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠকে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বেইজিং "আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার লঙ্ঘন" রোধে ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের বেইজিং সফর মূলত দুই শক্তির অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার উত্তেজনা হ্রাস করা নিয়ে হলেও— ইরান যুদ্ধই এখন সেখানে মূল আলোচ্য বিষয় হতে যাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গলবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, চীন যেন ইরানকে হরমুজ প্রণালি থেকে অবরোধ তুলে নিতে চাপ দেয়।
চীনা কর্মকর্তারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে আসছেন এবং নিজেদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরছেন। গত মাসে শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে চার দফার একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন। আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই সেই অবস্থানের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, চীন শান্তি আলোচনা শুরু করতে এবং "মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আরও বড় ভূমিকা পালন করতে" প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিবদমান দুই পক্ষকে নিজের কোর্টে পাওয়া শি জিনপিংয়ের জন্য একটি বড় বিজয়। এটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে চীনের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে। একজন অজনপ্রিয় মার্কিন নেতা, যিনি একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে আটকা পড়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা—তাঁর সঙ্গে দরকষাকষি করা শি-র জন্যও সুবিধাজনক অবস্থান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বেইজিং মনে করছে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই দীর্ঘ লড়াই তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, যা তার জন্য বেশ কঠিন হতে চলেছে। এই নির্বাচনের আগে ভোটারদের শান্ত করতে তিনি বড় কোনো সাফল্য দেখাতে মরিয়া। চীন এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় পরিমাণে মার্কিন কৃষিপণ্য বা বোয়িং জেট কেনার বিনিময়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে পারে।
তবে শান্তি ফেরাতে বেইজিং ইরানের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ শি একদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে বিশ্বশক্তি হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছেন।
ভারসাম্যের খেলা
পশ্চিমে প্রচলিত ধারণা হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের অন্য কোথাও ব্যস্ত থাকলে বেইজিং খুশি হয়। কিন্তু বর্তমান সংঘাত বন্ধ হওয়ার পেছনে চীনের নিজস্ব কিছু বাস্তব কারণ রয়েছে।
বিশাল তেলের মজুদ, জ্বালানি স্বনির্ভরতা এবং গ্রিন এনার্জিতে দ্রুত রূপান্তরের ফলে প্রতিবেশীদের তুলনায় চীন এই জ্বালানি সংকট থেকে কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই মজুদও ফুরিয়ে আসবে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য চীনের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের চরম অবনতি বেইজিংয়ের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের মধ্যেও চীন ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করেনি। গত মাসেও তারা দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল আমদানি করেছে, যা মূলত এশিয়া অঞ্চলে সাগরে ট্যাংকার জাহাজে থাকা মজুদ থেকে এসেছে।
গত বছর ইরানের রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল চীনের কাছে। ফলে ইরানের ওপর বেইজিংয়ের বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ওয়াশিংটন সম্প্রতি ইরানের তেল কেনার দায়ে একটি বড় চীনা পেট্রোকেমিক্যাল সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু বিরল এক পদক্ষেপে বেইজিং তাদের দেশীয় শোধনাগারগুলোকে মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞা না মানার নির্দেশ দিয়েছে।
চীন হয়তো ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য এবং বিশ্ববাসীর সামনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনার চেষ্টা করবে। তবে বিশ্লেষকরা সন্দিহান যে, ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বড় কোনো সুযোগ-সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত বেইজিং ইরানকে মার্কিন শর্ত মানতে খুব বেশি চাপ দেবে না।
প্রথমত, তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব কতটা কার্যকর তা নিয়ে খোদ চীনেরই সংশয় থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, চীন বরাবরই বলে আসছে যে—এই যুদ্ধ ওয়াশিংটনের তৈরি করা সমস্যা, তাই সমাধানও তাদেরই করতে হবে। সবশেষে, বিশ্বব্যাপী তেলের সংকটের এই সময়ে চীন নিজেও সেই ইরানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাই নিজের তেলের জোগান নিশ্চিত না করে তেহরানকে খুব বেশি চটানো বেইজিংয়ের জন্যও সহজ হবে না।
