ইরান কি যুদ্ধে চীনের তৈরি অতি-নিখুঁত 'বেইডো' নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে?
মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরান হয়তো চীনের স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করছে বলে সন্দেহ করছেন গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা।
ফ্রান্সের বৈদেশিক গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক পরিচালক অ্যালাইন জুইলেট এই সপ্তাহে পডকাস্ট 'টোকসিন'-এ বলেন, ইরান সম্ভবত চীনের 'বেইডো' স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পেয়েছে।
কারণ, গত জুনে ইসরায়েলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের হামলার লক্ষ্যভেদ করার ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত হয়েছে।
জুইলেট বলেন, 'এই যুদ্ধের অন্যতম বড় চমক হলো, আট মাস আগের তুলনায় ইরানের মিসাইলগুলো এখন অনেক বেশি নির্ভুল। এটি এই মিসাইলগুলোর গাইডেন্স বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।'
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতের পর ইরানও পাল্টা জবাব দেয়।
তারা ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন ছুড়েছে।
ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলো অনেক মিসাইল মাঝপথেই ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও, বেশ কিছু মিসাইল তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি ঘটিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের নিজস্ব গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম-এ জ্যামিং বা বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা আগে ইরানের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করত।
কিন্তু ইরান যদি চীনের 'বেইডো' সিস্টেম ব্যবহার করে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের করার খুব বেশি কিছু নেই।
ইরান অবশ্য এই বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য বা নিশ্চিতকরণ করেনি।
বেইডো নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম কী?
চীন তাদের স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ চালু করে ২০২০ সালে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস-এর অন্যতম বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২০ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন।
১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর জিপিএস-এ প্রবেশাধিকার হারানোর আশঙ্কায় চীন নিজস্ব এই স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেম তৈরির উদ্যোগ নেয়।
চীনের সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বেইডো সিস্টেমের মূল উদ্দেশ্য হলো 'বিশ্বের সেবা করা এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন'।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের এই সিস্টেমে স্যাটেলাইটের সংখ্যা অন্যান্য যেকোনো সিস্টেমের চেয়ে অনেক বেশি। আল জাজিরার ডেটা টিমের সংগৃহীত তথ্যমতে, মার্কিন জিপিএস সিস্টেমে ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, যেখানে চীনের বেইডো সিস্টেমে রয়েছে ৪৫টি।
বিশ্বের অন্য দুটি প্রধান নেভিগেশন সিস্টেম হলো রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও, যার প্রতিটিতে ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে।
বেইডোর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, সিস্টেমটি তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত – মহাকাশ অংশ, গ্রাউন্ড বা ভূমি অংশ এবং ব্যবহারকারী বা 'ইউজার' অংশ।
অন্যান্য নেভিগেশন সিস্টেমের মতোই বিশ্বব্যাপী কভারেজ দেওয়া বেইডো স্যাটেলাইট থেকে মাটিতে বা যানবাহনে থাকা রিসিভারে টাইমিং সিগন্যাল পাঠিয়ে কাজ করে।
একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সিগন্যাল রিসিভারে পৌঁছাতে কত সময় লাগে তা পরিমাপ করে সিস্টেমটি নিখুঁতভাবে ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজাহ ম্যাগনিয়ার বলেন, 'সাধারণ বেসামরিক সিগন্যালে অবস্থানগত নির্ভুলতা প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটারের মধ্যে থাকে, তবে অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের জন্য সংরক্ষিত সামরিক কাজে এটি আরও অনেক বেশি নিখুঁত হতে পারে।'
ইরান কি সত্যিই বেইডো ব্যবহার করছে?
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এটি নিশ্চিত করেনি। তাছাড়া গত বছর জুনের যুদ্ধের পর এত অল্প সময়ে সামরিক অভিযানে সম্পূর্ণ নতুন একটি স্যাটেলাইট সিস্টেম যুক্ত করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ওই সংঘাতের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে, ইরান 'বিশ্বের সমস্ত বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রযুক্তির উৎসের ওপর নির্ভর করে না।'
তবে জুইলেট বলেছেন, গত বছরের তুলনায় ইরানের হামলার নির্ভুলতা এতটা কীভাবে বাড়ল, তার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হলো চীনের বেইডো সিস্টেমে তাদের স্থানান্তর।
'জিপিএস সিস্টেমের জায়গায় একটি চীনা সিস্টেম প্রতিস্থাপনের কথা শোনা যাচ্ছে, যা ইরানি মিসাইলগুলোর এই নিখুঁত আঘাতকে ব্যাখ্যা করে। … এর ফলে তারা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পেরেছে।'
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান শুধু গত আট মাস নয়, বরং আরও অনেক আগে থেকেই চীনের এই নেভিগেশন সিস্টেম যুক্ত করার কাজ করে আসছিল।
চায়নামেড প্রজেক্টের গবেষক থিও ন্যানসিনি আল জাজিরাকে বলেন, '২০১৫ সালেই ইরান তাদের সামরিক অবকাঠামোতে বেইডো-২ যুক্ত করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল বলে জানা যায়।'
বিশেষ করে তাদের সশস্ত্র বাহিনী আগে যে বেসামরিক জিপিএস সিগন্যাল ব্যবহার করত, তার চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত সিগন্যাল দিয়ে মিসাইল গাইডেন্সের উন্নতি করাই ছিল এর লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি ধীরে ধীরে হলেও, ২০২১ সালের মার্চে চীন-ইরান ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর তা ত্বরান্বিত হয়।
সে সময়ই চীন ইরানকে বেইডোর এনক্রিপ্টেড সামরিক সিগন্যাল ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল বলে মনে করা হয়।
ন্যানসিনি বলেন, 'এরপর থেকেই ইরানি সামরিক বাহিনী মিসাইল এবং ড্রোনের দিকনির্দেশনা ও নির্দিষ্ট কিছু সুরক্ষিত যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বেইডো যুক্ত করতে শুরু করে।'
বাস্তবে এর অর্থ হলো, ইরান ২০২১ সালের দিক থেকেই ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস-এর ব্যবহার কমিয়ে আনছিল।
'কিছু বিশ্লেষক আগেই বলেছিলেন যে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইসরায়েলের ওপর ইরানের প্রথম মিসাইল হামলায় বেইডো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই হামলাগুলোর নির্ভুলতা ছিল চোখে পড়ার মতো।'
তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান ২০২৫ সালের জুনে, ঠিক ১২ দিনের যুদ্ধের পরই পরিবহন এবং লজিস্টিকসের মতো বেসামরিক ব্যবহারসহ সামগ্রিকভাবে বেইডো সিস্টেমে স্থানান্তর সম্পন্ন করে।
ওই যুদ্ধের সময় জিপিএস জ্যামিংয়ের কারণে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন এবং বেসামরিক বিমান ও জাহাজের নেভিগেশন দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
ন্যানসিনি বলেন, 'বেইডোর দিকে ইরানের এই ঝুঁকে পড়া তাদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগেরই প্রতিফলন, যা প্রমাণ করে যে ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণকারী প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে তারা সচেতন। তবে ১২ দিনের যুদ্ধটি নিশ্চিতভাবেই একটি মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা ছিল, যা তেহরানকে গত বছর এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বাধ্য করে।'
বেইডো কীভাবে হামলার নির্ভুলতা বাড়াতে পারে?
বেইডো সিস্টেম ব্যবহার করে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারবে।
ম্যাগনিয়ার ব্যাখ্যা করেন, এতদিন ধরে বিশ্বাস করা হতো যে ইরানের মিসাইল ও ড্রোনগুলো মূলত ইনর্শিয়াল নেভিগেশন সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল।
'এই সিস্টেমগুলো জাইরোস্কোপ এবং অ্যাক্সেলেরোমিটারের মতো সেন্সরের মাধ্যমে গতি এবং ত্বরণ মেপে অস্ত্রের অবস্থান নির্ধারণ করে। এর সুবিধা হলো এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বাইরের কোনো হস্তক্ষেপ দ্বারা প্রভাবিত হয় না,' তিনি আল জাজিরাকে বলেন।
'তবে এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে: সময় এবং দূরত্বের সাথে সাথে ছোট ছোট পরিমাপের ত্রুটিগুলো জমতে থাকে, যা ধীরে ধীরে এর নির্ভুলতা কমিয়ে দেয়। স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিগন্যাল এই সমস্যারই সমাধান করে।'
তিনি আরও বলেন, 'সাধারণত, একটি মিসাইল তার প্রাথমিক গতিপথ ধরে রাখতে ইনর্শিয়াল নেভিগেশন ব্যবহার করে, আর স্যাটেলাইট সিগন্যাল সেই পথকে আরও নিখুঁত করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা বাড়ায়। এই পদ্ধতিটি সামগ্রিকভাবে আঘাতের নির্ভুলতায় ব্যাপক উন্নতি আনে।'
তিনি মনে করেন, ইরানের পক্ষে শুধু একটির ওপর নির্ভর না করে একাধিক নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করাই যুক্তিসঙ্গত হবে।
'একই সাথে একাধিক স্যাটেলাইট সিস্টেমের ব্যবহার সিগন্যাল জ্যামিং বা বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়,' তিনি ব্যাখ্যা করেন।
'বিরূপ পরিবেশে নেভিগেশন সিগন্যালে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়া হতে পারে। যদি একটি অস্ত্র শুধুমাত্র একটি স্যাটেলাইট সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে, তবে সেই সিগন্যাল ব্যাহত হলে তার নির্ভুলতা কমে যেতে পারে। কিন্তু যেসব গাইডেন্স সিস্টেম একাধিক নেটওয়ার্ক থেকে সিগন্যাল নিতে পারে, সেগুলো জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে অনেক বেশি টিকে থাকতে সক্ষম। তাছাড়া, বেশি স্যাটেলাইটের সংযোগ সিগন্যালের জ্যামিতি উন্নত করে, যা অবস্থানগত নির্ভুলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।'
ধারণা করা হয়, চীনা নেভিগেশন সিস্টেমের ভুলের মাত্রা বা 'মার্জিন অফ এরর' এক মিটারেরও (৩.৩ ফুট) কম, যার মানে এটি অত্যন্ত নিখুঁত।
বিশ্লেষকদের মতে, লক্ষ্যবস্তু যদি নড়েও যায়, তবুও এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দিক সংশোধন করতে পারে।
ন্যানসিনি আল জাজিরাকে বলেন, 'বেসামরিক জিপিএস সিগন্যালে যতটুকু নিখুঁত হওয়া সম্ভব, এটি তার চেয়েও অনেক উন্নত।কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রুদের জন্য তাদের এনক্রিপ্টেড সামরিক সিগন্যাল ব্যবহারের পথ বন্ধ করে রাখে।'
তাছাড়া, গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল যেসব পশ্চিমা জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করেছিল, তা এড়াতেও এটি ইরানকে সাহায্য করবে।
জ্যামিং কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুল স্থানাঙ্ক দিয়ে আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বোকা বানানো। বেইডো সিস্টেম এ ধরনের বাধা ফিল্টার বা পরিশ্রুত করতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স বলেন '২০২৫ সালে যেসব সাধারণ জিপিএস সিগন্যাল অকেজো করে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর মতো নয় বেইডোর সামরিক-স্তরের সিগন্যাল। একে জ্যাম করা কার্যত অসম্ভব।'
বেইডো সিস্টেমে শর্ট মেসেজ যোগাযোগের সুবিধাও রয়েছে, যার মাধ্যমে অপারেটররা উড়ন্ত অবস্থায় থাকা ড্রোন বা মিসাইলের সাথে ২,০০০ কিলোমিটার (১,২৪০ মাইল) দূর থেকেও যোগাযোগ করতে পারে। মারিন্স বলেন, এর মানে হলো উৎক্ষেপণের পরও এগুলোকে চাইলে নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
ইরানের বেইডো ব্যবহার কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি সত্যিই বেইডো প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে থাকে, তবে তা যুদ্ধের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিতে পারে।
ম্যাগনিয়ার বলেন, 'স্যাটেলাইট নেভিগেশনের বিবর্তন আধুনিক যুদ্ধের দৃশ্যপটকে বদলে দিয়েছে। একসময় শুধু গুটি কয়েক উন্নত সামরিক শক্তির হাতেই নিখুঁত হামলার সক্ষমতা ছিল। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাপী নেভিগেশন অবকাঠামোর সহজলভ্যতার কারণে এই সক্ষমতা অনেকের হাতেই চলে যাচ্ছে। দূরপাল্লার অস্ত্রগুলো যত বেশি নিখুঁত এবং জ্যামিং প্রতিরোধী হয়ে উঠবে, বেইডোর মতো সিস্টেমগুলো সমসাময়িক সংঘাতের প্রযুক্তিগত ভিত্তির ক্ষেত্রে তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।'
ন্যানসিনির যুক্তি, বেইডোর এই কার্যকারিতা যদি প্রমাণিত হয়, তবে তা ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে, এমনকি বর্তমানে যারা ইরানি মিসাইলের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে তাদেরকেও জিপিএস-এর ওপর নিজেদের নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
'সময়ের সাথে সাথে এটি আঞ্চলিক স্যাটেলাইট নেভিগেশন কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আরও বহুমুখী একটি ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।'
ন্যানসিনি আরও বলেন, বর্তমান এই যুদ্ধ চীনকেও একটি দারুণ সুযোগ করে দিচ্ছে।
নজরদারি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তারা সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ তো করছেই, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল সংঘাতে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত—তাদের গাইডেন্স সক্ষমতার সরাসরি 'মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষা' বা ফিল্ড-টেস্ট করার সুযোগও পাচ্ছে।
'এই যুদ্ধের মাধ্যমে চীন মার্কিন এফ-৩৫-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে তাদের সিস্টেম কতটা কার্যকর তা মূল্যায়ন করতে পারছে। একই সাথে, বেইডো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ইরানি মিসাইল ও ড্রোন বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে মূল্যবান তথ্যও সংগ্রহ করছে।'
ইরানের কাছে কতগুলো ব্যালিস্টিক মিসাইল আছে?
ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও, এটিকে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং উন্নত মজুত বলে মনে করা হয়।
ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো কয়েকশ কিলোমিটার থেকে শুরু করে ১০ হাজার কিলোমিটার (৬,২০০ মাইল) পর্যন্ত পাড়ি দিয়ে মহাদেশ পার হতে পারে।
জুইলেট টোকসিন পডকাস্টে বলেন, ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানে শনাক্তযোগ্য সকল লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করলেও, ইরানি মিসাইলের আসল সংখ্যা এবং সেগুলো কোথায় কীভাবে রাখা আছে, তা কারোই জানা নেই।
'ইরান ফ্রান্সের চেয়ে তিনগুণ বড় একটি দেশ, আর মিসাইলগুলো ট্রাকে করে সারা দেশে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। এত বিশাল এলাকায় এই ট্রাকগুলোর খোঁজ রাখা কীভাবে সম্ভব?'
তিনি আরও বলেন, যেহেতু বর্তমান যুদ্ধটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তাই ইরান হয়তো ১২ দিনের যুদ্ধের চেয়ে এবার অনেক বেশি 'বিচক্ষণতার' সাথে তাদের মিসাইলগুলো মোতায়েন করছে।
এরই মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, ইরান তাদের মজুত করা ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগেই, সস্তা ইরানি শাহেদ ড্রোনগুলো ভূপাতিত করতে গিয়ে তাদের দামী ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলো ফুরিয়ে যেতে পারে।
এই কারণে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইউক্রেনকে অনুরোধ করেছে—যেখানে রাশিয়া ইরানি-নির্মিত শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করছে—তারা যেন নিজেদের তৈরি ও ব্যাপকভাবে উৎপাদিত সস্তা ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শেয়ার করে।
