গীতা মেহতার প্রয়াণ: ভারতের সমাজ-সংস্কৃতির বিনির্মাণে যার লেখনী অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিল
গত শনিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিজ বাসভবনে মারা গেছেন খ্যাতিমান লেখক ও সাংবাদিক গীতা মেহতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০।
আধুনিক ভারতের ওপর পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব খতিয়ে দেখা, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা শ্বেতাঙ্গ পুরুষের আধিপত্যকে পাশ কাটিয়ে ভারতীয়, সর্বোপরি নারীকে 'সাবজেক্ট' হিসেবে তুলে আনা সেই গীতা মেহতা আর নেই।
নফের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রচার পরিচালক নিকোলাস ল্যাটিমার জানান, স্ট্রোক সংক্রান্ত জটিলতায় গীতার মৃত্যু হয়েছে। গীতার স্বামী সনি মেহতা বহু বছর এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও এডিটর ইন চিফ পদে ছিলেন।
সনি মেহতা ছিলেন তার সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সম্পাদকদের একজন। নিউইয়র্ক, লন্ডন আর ভারত-যখন যেখানে থেকেছেন সেখানকার সাহিত্য পরিমণ্ডলে ছিল এই দম্পতির সরব উপস্থিতি।
১৯৭৯ সালে গীতা মেহতার প্রথম বই 'কারমা কোলা: মার্কেটিং দ্য মিস্টিং ইস্ট' প্রকাশিত হয়।
নিউজডে-তে পলি মরিস গীতার এ বইয়ের পর্যালোচনায় লিখেন, গীতা সেই পশ্চিমকে দেখেন যা এর মাত্রাতিরিক্ত নার্সিসিজমকে প্রাচ্যধর্মে বিনিয়োগ করতে চায়, আর প্রাচ্যও তার আত্মাকে শেষ করে দিয়ে পশ্চিমা প্রযুক্তিতে ভবিষ্যত বিনিয়োগের আশা হাতড়াচ্ছে।"
১৯৮৯ সালে 'রাজ' এর ক্ষেত্রেও গীতা একই ধারা অনুসরণ করেন। এর সময়কাল গত শতকের প্রথম দশক, যখন ব্রিটিশরা উপমহাদেশ শাসন করছিল। ঐতিহাসিক উপন্যাসটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে উত্তর ভারতের রাজস্থানে এক রাজবাড়িতে বেড়ে ওঠা রাজকন্যাকে ঘিরে।
নারী চরিত্রকে কেন্দ্রে রেখে রচিত 'রাজ' হয়ে ওঠে অন্যান্য লেখার চেয়ে আলাদা।
দ্য টেলিগ্রাফকে লেখিকা বলেন, "নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে আমাকে এটি লিখতে হয়েছিল।"
"ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অত্যন্ত সফলভাবে ভারতীয় শাসকদের দুর্বল করে দিয়েছিল- একমাত্র নারীদেরই তারা স্পর্শ করতে পারেনি।"
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত 'আ রিভার সুত্রা'-তে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীর নদীতীরে শান্তি খোঁজার মধ্যে একগুচ্ছ গল্প উঠে আসে।
১৯৯৭ সালে ভারতের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে 'স্নেকস অ্যান্ড ল্যাডার্স: গ্লিম্পসেস অব ইন্ডিয়া' প্রবন্ধ সংকলনের মাধ্যমে গীতা নন-ফিকশনে ফিরে আসেন।
ভারত এবং পূর্বাঞ্চলের দেশগুলো অনগ্রসর বা পিছিয়ে আছে এমন ধারণা গীতা মেহতা পোষণ করতেন না। বিভিন্ন সাক্ষাতকারেও তিনি বলতেন, গণিত, চিকিৎসা এবং অন্যান্য অগ্রগতি পশ্চিমের তুলনায় প্রাচ্যে আগে এসে পৌঁছেছিল।
১৯৯৭ সালে ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-কে তিনি বলেছিলেন, "এসব সাম্রাজ্যবাদের অংশ; আপনার মধ্যে এই বিশ্বাস গেঁথে গেছে যে, আপনার হাতের কাছে যা কিছু মেলে তা অবধারিতভাবে পশ্চিমাই হতে হবে।"
সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভারত এবং পূর্বের বাকি অংশ সম্পর্কে তিনি ই. এম. ফরস্টার এবং রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর মতো লেখকদের সীমাবদ্ধতার কথাও জানতেন।
১৯৯১ সালে পাবলিক রেডিও শো 'ফ্রেশ এয়ার'-এ তিনি বলেছিলেন, "একজন ব্রিটিশ যেভাবে উপনিবেশিত মানুষদের দেখে, সে চোখে, সেই ব্রিটিশ প্রিজমের মধ্য দিয়ে এই লেখকেরা ভারত সম্পর্কে লিখেছিল।"
"সেদিক থেকে আমার মতে, সে চিত্রায়ন যথাযথ ছিল না। তাছাড়া তাদের লেখার কেন্দ্রে ছিলেন পুরুষেরা", বলেন গীতা।
১৯৪২ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজু এবং জ্ঞান পট্টনায়কের ঘরে জন্ম গীতা পট্টনায়েকের। চল্লিশের দশকে তার বাবা ছিলেন একজন অকুতোভয় পাইলট; যিনি তৎকালীন বার্মায় ব্রিটিশদের জন্য ফ্লাইং মিশন চালাতেন, আবার স্বাধীনতার স্বপক্ষ আন্দোলনের জন্য গোপনে কাজ করতেন।
গীতার ভাষ্যে, "আমার জন্মের মাত্র দুই সপ্তাহ পরে, বাবাকে হাতকড়া পরিয়ে ব্রিটিশ জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাকে সাড়ে তিন বছরের জন্য রাখা হয়।"
১৯৪৬ সালে জেল থেকে মুক্তির পর গীতা মেহতার পিতা একজন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ হিসাবে সফল কর্মজীবন শুরু করেন।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে পড়তে গিয়ে গীতার পরিচয় হয় অজয় সিং মেহতার সঙ্গে, যিনি সনি নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে গীতা-সনি সাতপাঁকে বাধা পড়েন।
এরপর কিছুদিন বোম্বে ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন গীতা। ব্রিটিশ টেলিভিশনের জন্য ডকুমেন্টারিতেও কাজ করেন; কিন্তু বেশিদিন সে কাজ তার করা হয়ে ওঠেনি।
২০১৯ সালে গত হন সনি মেহতা। গীতা মেহতার পরিবার বলতে এখন ছেলে আদিত্য মেহতা, নাতনী, আর দুই ভাই- প্রেম ও নবীন পট্টনায়েক। নবীন পট্টনায়েক বর্তমানে ভারতের ওডিশা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।
