ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা হামলা, নিহত অন্তত ৩, আহত কয়েক ডজন; ইরানেও চলছে হামলা
ইসরায়েলের হামলার জবাবে ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ইরান। 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৩' নামক এ অভিযানে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে অন্তত তিনজন নিহত ও কয়েক ডজন আহত হয়েছেন।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত এক ইসরায়েলি নারী শনিবার সকালে হাসপাতালে মারা যান। এছাড়া চতুর্থ দফায় হামলায় মধ্য ইসরায়েলে, তেল আবিবের দক্ষিণে আরেকজন নিহত হয়েছেন। এ হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। তেল আবিবের পূর্বাঞ্চলে ইরানের হামলার সময় অস্ত্রের খণ্ডাংশ পড়ে এক নারী মারা যান।
এছাড়া ফক্স নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ইসরায়েলের সামরিক সদর দপ্তর 'কিরিয়াত'-এ সরাসরি আঘাত হানে—যা দেশটির জন্য 'পেন্টাগন'-এর সমতুল্য।
ফক্স নিউজের প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা ট্রে ইংস্ট তেল আবিব থেকে সরাসরি সম্প্রচারে বলেন, এই কম্পাউন্ডের একটি ভবন সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। ভবনটির বড় রকমের ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে ইরানেও দফায় দফায় নতুন করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসফাহান শহরে নতুন করে চালানো ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহতের চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরানের উত্তরাঞ্চলের জানজান শহরে অবস্থিত একটি সেনাঘাঁটিতেও বোমাবর্ষণ করেছে। রাজধানী তেহরান থেকে শহরটি প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার দূরে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হামলার ঘণ্টাখানেক পরও ঘটনাস্থলে ঘন ধোঁয়া ও আগুন জ্বলছিল।
এছাড়া বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, তেহরানের পূর্বাঞ্চলের হাকিমিয়েহ ও তেহরানপারস এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে তেহরানের মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, যার ফলে সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ফক্স নিউজের ইংস্ট বলেন, রাতে ইরান থেকে প্রায় ১৫০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ইসরায়েলের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
ফক্স নিউজ একাধিক আঘাতস্থলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র প্রত্যক্ষ করেছে। ইংস্ট বলেন, 'গোটা একটি ব্লক প্রায় সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, যেন মানচিত্র থেকেই মুছে গেছে।'
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন আয়রন ডোম, ডেভিড'স স্লিং, অ্যারো, প্যাট্রিয়ট ও থাড সক্রিয় থাকার পরও কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে।
ইংস্ট বলেন, 'এটি [প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা] এই হামলা প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মাটিতে আছড়ে পড়া দেখেছি—তীব্র ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং অন্তত একজন নিহত হয়েছেন।'
গতকাল ইরানের বিভিন্ন শহর, সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক কেন্দ্রে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে ৬ জন, পরমাণুবিজ্ঞানী ও একাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাসহ এ পর্যন্ত ৭৮ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। আহত হয়েছেন ৩২০ জনেরও বেশি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এ হামলার জন্য ইসরায়েল যেন 'চরম শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাকে'।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের 'অপারেশন রাইজিং লায়ন' নামক সামরিক অভিযান যত দিন প্রয়োজন, তত দিন চলবে।
এদিকে শুক্রবার ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের পাল্লার মধ্যে আছে। প্রয়োজন পড়লে তারা সেখানে হামলা চালাবে। জাতিসংঘে ইরানের মিশন নিরাপত্তা পরিষদে চিঠি দিয়ে করে জানায়, ইসরায়েলের 'পৃষ্ঠপোষক' হিসেবে এই ঘটনার জন্য 'সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবে' যুক্তরাষ্ট্র।
ইসরায়েলকে ইরানের হামলা থেকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সহায়তা
শুক্রবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলকে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের জবাবে ইরান যেসব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, সেগুলোর একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় প্রতিহত করা হয়।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনা ও ইসরায়েলের সুরক্ষায় পেন্টাগন যুদ্ধজাহাজসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ পুনঃবিন্যাস করেছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস টমাস হান্ডারকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দিকে অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আরেকটি ডেস্ট্রয়ার শিগগিরই সেখানে যোগ দিতে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নাম না প্রকাশের শর্তে নিউইয়র্ক টাইমসকে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বিমানবাহিনী অচিরেই মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত আকাশে ইতিমধ্যে মার্কিন যুদ্ধবিমান টহলরত রয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা এপি-কে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলো পুনঃবিন্যাসের উদ্দেশ্য ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইসরায়েলকে সহায়তা করা।
এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্থলভিত্তিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও থার্মিনা হাই অল্টিচ্যুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থাও ব্যবহার করেছে।
গত অক্টোবরেও ইসরায়েল হিজবুল্লাহর এক নেতাকে লিবিয়ায় ও হামাসের শীর্ষ নেতাকে ইরান সফরকালে হত্যার সময় ইসরায়েলকে সহায়তা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ইসরায়েল একটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য হতে পারে আরও ইরানি সামরিক কমান্ডারদের হত্যা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশ ধ্বংস করা।
শুক্রবারই ইসরায়েল ইঙ্গিত দেয়, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ফোর্দো সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র।
প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা বলেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেবে।
